বৃহস্পতিবার, ৩০ মে ২০২৪, ০৮:০৬ অপরাহ্ন

চাপে পড়ে ১২শ কোটি টাকা ফেরত ৫৪২ ঋণখেলাপির

রিপোর্টারের নাম / ২৩৫ বার দেখা হয়েছে
আপডেট করা হয়েছে

চট্টগ্রামের মহল মার্কেট বন্ধক রেখে ফারমার্স ব্যাংক থেকে ৬০ কোটি টাকা ঋণ নেন ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিন আহমেদ। যথাসময়ে ঋণ পরিশোধ করতে না পারায় তা খেলাপি হয়ে যায়। সুদে-আসলে ব্যাংকের পাওনা দাঁড়ায় ৮৬ কোটি টাকা। অনেক দেনদরবার করেও ঋণের অর্থ আদায় করতে না পেরে অর্থঋণ আদালতে মামলা করে ব্যাংক। সেই মামলায় আদালত বন্ধকি মহল মার্কেটে কোতোয়ালি থানার ওসিকে রিসিভার নিয়োগ করেন। রিসিভার মার্কেটের ভাড়া তুলে তা ব্যাংকে জমা করতে শুরু করেন। ‘রিসিভার নিয়োগ’ পদ্ধতি ব্যবহার করার পরই খেলাপি ঋণ ফেরত দিতে বিদ্যুৎ গতিতে উদ্যোগী হন ঋণখেলাপি জসিম। বন্ধকি সম্পদ হাতছাড়া হওয়ার পরই মাত্র ৯ মাসের মাথায় ১ ফেব্রুয়ারি ঋণের ২৫ কোটি টাকা আদালতে জমা দিতে বাধ্য হন তিনি। বাকি ৩৫ কোটি টাকা তিন মাসে ফেরত দেওয়ার চুক্তি করেন।

শুধু রিসিভার নিয়োগই নয়; সর্বশেষ গত ২৮ মার্চ ১২ বছর আগের রূপালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের মামলায় ১ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ পরিশোধ করে জামিন পান চট্টগ্রামের বনেদি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান মোস্তফা গ্রুপের মালিক হেফাজতুর রহমান, জহির উদ্দিনসহ আট পরিচালক, চেয়ারম্যান ও এমডি। এর আগে ১৯ ফেব্রুয়রি ১৮ বছরের পুরোনো ইসলামী ব্যাংকের ঋণখেলাপি মামলায় সাড়ে ১০ কোটি টাকা পরিশোধ করে মেসার্স সিদ্দিকী অ্যান্ড কোম্পানি মামলা থেকে অব্যাহতি নেয়। ২২ ফেব্রুয়ারি প্রাইম ব্যাংকের মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির তিন ঘণ্টার মধ্যে ৭০ লাখ টাকা পরিশোধ করে জামিন নেন ছিদ্দিক ট্রেডার্সের মালিক আবু সাঈদ চৌধুরী। একইভাবে জেল খাটা থেকে বাঁচতে ১০ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ চোখ বুজে ফেরত দিতে বাধ্য হন ব্যবসায়ী তিন ভাই মোহাম্মদ হাসান, মহসীন ও সেলিম। সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীর মেসার্স লোটাস করপোরেশনের মালিক তাঁরা।

রিসিভার নিয়োগ ও পরোয়ানার মতো দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পরই ২২ বছর আগের ঋণখেলাপি মামলায় ৬০ কোটি টাকা পরিশোধ করে মামলা থেকে অব্যাহতি নেন পাঁচ ব্যবসায়ী। গত ১৩ নভেম্বর আদালতে খেলাপি ঋণ সম্পূর্ণ পরিশোধ করার রসিদ জমা দেন। তারপর দেশত্যাগে জারি করা নিষেধজ্ঞা প্রত্যাহার ও মামলা থেকে তাঁদের অব্যাহতি দেন বিচারক। অব্যাহতিপ্রাপ্তরা হলেন– মেসার্স মোনাভী টেক্সটাইল কমপ্লেক্স লিমিটেডের পরিচালক ইদ্রিস মিনহাজ, ইলিয়াস মুরাদ, সামসুদ্দিন রিয়াদ, শামসুল আলম ফয়সাল ও ফারজানা মুরাদ। ১৯৯৯ সালে আইএফআইসি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তা আর ফেরত দেননি তাঁরা। এভাবে চট্টগ্রামে ১০ বছর, ১৫ বছর ও ২২ বছর আগে মেরে দেওয়া ১ হাজার ১৯১ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ পরিশোধ করতে বাধ্য হলেন ৫৪২ ব্যবসায়ী। খেলাপি ঋণ পরিশোধে বাধ্য হওয়া ব্যবসায়ীদের মধ্যে বনেদি শিল্প গ্রুপের মালিক, সংসদ সদস্যের স্বামী-শ্বশুর থেকে শুরু করে বড়-ছোট সব ব্যবসায়ীই রয়েছেন। বছরের পর বছর ধরে বকেয়া পড়ে থাকা খেলাপি ঋণ মূলত রিসিভার নিয়োগ, সাজা পরোয়ানা জারি, দেওয়ানি সাজা, দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা ও পাসপোর্ট জব্দ করার মতো কড়া পদক্ষেপ নেওয়ায় ব্যাংকগুলোকে খেলাপি ঋণ ফেরত দিতে বাধ্য হন তাঁরা।

অর্থঋণ মামলাবিষয়ক একাধিক ব্যাংকের প্যানেল আইনজীবী জিয়া হাবীব আহসান বলেন, চট্টগ্রামে ২২ বছরের পুরোনো থেকে দুই বছরের খেলাপি হয়ে যাওয়া ঋণখেলাপি মামলায় ঋণ আদায়ে দেশের মধ্যে চট্টগ্রাম অর্থঋণ আদালত এখন একটি রোল মডেল। কারণ এক বছর আগেও চট্টগ্রামের ঋণখেলাপিরা মনে করতেন ব্যাংকের অর্থ আত্মসাৎ করে ঋণখেলাপি হলেও তাঁরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাবেন। কিন্তু অর্থঋণ আদালতের বিচারক (যুগ্ম জেলা জজ) মুজাহিদুর রহমান ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে একের পর এক দেওয়ানি সাজা দিতে শুরু করেন। একই সঙ্গে যখন বন্ধকি সম্পদের ওপর রিসিভার নিয়োগ, সাজা পরোয়ানা জারি, দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা ও পাসপোর্ট জব্দ শুরু করলেন– তখনই চট্টগ্রামের ঋণখেলাপি ব্যবসায়ীরা একে একে আত্মসাৎ করা খেলাপি ঋণ ফেরত দিতে বাধ্য হন। অনেক ব্যবসায়ীকে জেলেও যেতে হয়েছে। চট্টগ্রামের মতো সারাদেশের অর্থঋণ আদালত এ ধরনের কঠোর পদক্ষেপ নিলে খেলাপি ঋণ সহনীয় পর্যায়ে আসতে বাধ্য।

ইস্টার্ন ব্যাংকের সিনিয়র কর্মকর্তা আরিফুল হক জানান, বছরের পর বছর বহু চেষ্টা করেও বিপুল খেলাপি হওয়া ঋণ আদায় করতে পারছিলাম না। অর্থঋণ আদালত কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার পরই বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ আদায় হচ্ছে। ঋণখেলাপিরা টাকা পরিশোধ করতে বাধ্য হচ্ছেন।

আদালতের বেঞ্চ সহকারী রেজাউল করিম বলেন, আদালতের কঠোর অবস্থানের কারণে বাধ্য হয়ে ৫৪২ ঋণখেলাপি ব্যবসায়ী এক বছর ১ হাজার ১৯১ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পরিশোধ করেছেন। প্রতি মাসেই খেলাপি ঋণ পরিশোধের পরিমাণ বাড়ছে।

হাইকোর্টে ব্যর্থ হয়ে ১৩৮ কোটি টাকা পরিশোধ: চট্টগ্রামে অগ্রণী ব্যাংকের ঋণখেলাপি হওয়া ১৯০ কোটি টাকা উদ্ধারে বন্ধকি সম্পদের ওপর রিসিভার নিয়োগ দেন আদালত। অর্থঋণ আদালতের এ আদেশ স্থগিত করতে হাইকোর্টে ছুটে যান ঋণখেলাপিরা। কিন্তু উচ্চ আদালত রিসিভার নিয়োগের আদেশ বহাল রাখার পরই দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যায় ঋণখেলাপিদের। বন্ধকি সম্পদ থেকে লাখ লাখ টাকা ভাড়া আদায় হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার পরই বাধ্য হয়ে গত ১৭ নভেম্বর ব্যাংককে ১৩৮ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ ফেরত দেন আট ঋণখেলাপি। তারা হলেন– মেসার্স জয়নাব ট্রেডিং কোম্পানি লিমিটেডের এমডি মোহাম্মদ আবদুল্লাহ মাহমুদ, রাইয়ান পিয়ারা নাহাস, শাহ ইয়াছিন, শাহ ইমরান, শাহ নেওয়াজ, শাহ মোহাম্মদ আরাফাত, সামশুল আলম ও আয়েশা সিদ্দিকা।

৪ কোটি টাকা ফেরত দেন এমপি সনির স্বামী: শুধু জেলযাত্রা থেকে বাঁচতে এমপি সনির স্বামী মো. পারভেজ আলম খেলাপি ঋণের ৪ কোটি টাকা ব্যাংককে ফেরত দিতে বাধ্য হন। সাত বছর আগে খেলাপি হওয়া ঋণের ১৫ কোটি টাকার মধ্যে ৪ কোটি টাকা জমা দিয়ে জামিন নেন তিনি। খেলাপি ঋণের টাকা পরিশোধ না করায় সংসদ সদস্য খাদিজাতুল আনোয়ার সনির স্বামী আলমের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ইস্যু করেন আদালত। নগরীর খাতুনগঞ্জ শাখা সাড়ে ১৫ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ঋণখেলাপির দায়ে ২০১৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি ছয়জনের বিরুদ্ধে মামলা করে ওয়ান ব্যাংক।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর
Theme Created By Limon Kabir