রমজান আমাদের জীবনে এসেছিল আত্মশুদ্ধির মহাস্নান ও রহমতের অন্তহীন অফার নিয়ে। এসেছিল হৃদয়ের ধুলো ঝেড়ে আলোর পথে ফেরার ডাক নিয়ে। রমজানের প্রশিক্ষণ ছিল সংযম, ক্ষুধা ও তৃষ্ণার ভিতরে তাকওয়ার স্বাদ খুঁজে নেওয়া। প্রশিক্ষণ ছিল মানুষের প্রকৃত শক্তি ভোগে নয়, বিরতিতে। রমজান মনে করিয়ে গেছে, দানই সম্পদ পবিত্র করে, ক্ষমাই সম্পর্ক সুন্দর করে। রমজান ছিল গুনাহ মুছে ফেলার সুবর্ণ সুযোগ, রহমত ও মাগফিরাতের বসন্তকাল।
রমজান শিখিয়েছে রোজা শুধু খাদ্য থেকে বিরত থাকা নয়, অন্যায় ও অশ্লীলতা থেকেও দূরে থাকা। রমজান আমাদের কোরআনের ছায়ায় ফিরিয়ে আনে; জীবন নতুন করে সাজানোর প্রেরণা দেয়। রমজান বলে, দুনিয়া ক্ষণিক, আখেরাত চিরন্তন; তাই প্রস্তুত হও আজই। রমজান আসে আল্লাহর নৈকট্যের সোনালি সিঁড়ি হয়ে, যে উঠতে জানে সে-ই সফল। এক মাসের সিয়াম, তারাবি, কিয়ামুল লাইল, কোরআন তিলাওয়াত সব মিলিয়ে মুমিনের অন্তর যেন নতুন করে গড়ে ওঠে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, রমজান শেষ হলে আমাদের জীবন কেমন হবে? এই এক মাসের সাধনা শুধু ক্যালেন্ডারের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি রূপ নেবে স্থায়ী জীবন গড়ার সাধনায়? পবিত্র কোরআনের বাণী রমজানে আমরা অনেকবার শুনেছি, লেখেছি-‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।’ (সুরা আল বাকারা : ১৮৩) এ আয়াত আমাদের স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, রমজানের লক্ষ্য শুধু ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করা নয়; বরং তাকওয়া অর্জন করা।
তাকওয়া মানে অন্তরের এমন এক সতর্কতা, যা মানুষকে প্রকাশ্য ও গোপনে আল্লাহভীরু করে তোলে। যদি রমজানের পর আমাদের নামাজে শৈথিল্য আসে, কথাবার্তায় অশ্লীলতা ফিরে আসে, লেনদেনে অসততা ঢুকে পড়ে তবে বুঝতে হবে রোজার মূল শিক্ষা আমরা আত্মস্থ করতে পারিনি।
রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও সে অনুযায়ী কাজ পরিত্যাগ করল না, তার পানাহার ত্যাগ করার কোনো প্রয়োজন আল্লাহর নেই।’ (সহি বুখারি) এ হাদিস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, রোজার প্রকৃত ফল আচরণে প্রতিফলিত হওয়া উচিত। রমজান-পরবর্তী জীবন তাই হবে সত্যভাষী, সৎ ও সংযমী জীবনের ধারাবাহিকতা। অফিসে, ব্যবসায়, রাজপথে, পারিবারিক সম্পর্কে, সবখানে রমজানের শিক্ষার ছাপ থাকতে হবে। রমজান আমাদের কোরআনের সান্নিধ্যে নিয়ে আসে। রমজান শেষে যদি কোরআনকে ছেড়ে দিই, তবে সে সম্পর্ক ক্ষণস্থায়ী হয়ে পড়ে। অথচ আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই এই কোরআন এমন পথে পরিচালিত করে, যা সর্বাধিক সরল।’ (সুরা আল ইসরা : ৯) অতএব, রমজান-পরবর্তী জীবনে কোরআন হবে আমাদের নিত্যসঙ্গী। প্রতিদিন অল্প হলেও তিলাওয়াত, অর্থ অনুধাবন ও আমলের চেষ্টা-এটাই হবে রমজানের সত্যিকারের প্রভাব।
লেখক : গবেষক, ইসলামিক রিচার্স সেন্টার, বসুন্ধরা, ঢাকা
প্রকাশক : সোহেল রানা সম্পাদক: আব্দুস সামাদ সায়েম
©২০১৫-২০২৫ সর্বস্ত্ব সংরক্ষিত । তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় কর্তৃক নিবন্ধনকৃত (নিবন্ধন নং-২১০)