
ইরানের বিরুদ্ধে স্থল আক্রমণের সম্ভাবনা বিবেচনা করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এমন প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যে বহু মার্কিন প্যারাট্রুপার যুদ্ধে অংশ নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থল অভিযান শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্রের অভিজাত ৮২তম এয়ারবর্ন ডিভিশনের প্রায় ২,০০০ সেনা প্যারাসুটে করে ইরানে নামতে পারে। এছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যে বাড়তি আরও ১০ হাজার স্থলসেনা পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এবং মার্কিন যুদ্ধ মন্ত্রণালয় তথা প্রতিরক্ষা বিভাগ পেন্টাগন।
ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখে শুরু হওয়া মার্কিন-ইসরাইলি বিমান হামলার পর এই যুদ্ধ শুরু হয়। সেখানে স্থলসেনা পাঠানো হলে তা উত্তেজনা আরও বাড়াবে। আক্রমণকারী বাহিনীর অগ্রভাগ হিসাবে কাজ করতে পারে ৮২তম এয়ারবর্নের সৈন্যরা। শত্রুভাবাপন্ন পরিবেশে ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে তারা বিশেষজ্ঞ। এই বাহিনী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিশ্বের যে কোনো স্থানে মোতায়েন হতে পারে। তারা প্যারাসুটে নেমে বিমানঘাঁটি, বন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো দখল করতে সক্ষম। যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী এই সামরিক ইউনিটটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় খ্যাতি অর্জন করে। এরপর থেকে প্রায় সব বড় সংঘাতেই তাদের অংশগ্রহণ রয়েছে। তবে উপসাগরীয় অঞ্চলে এই বাহিনী কীভাবে ব্যবহার করা হতে পারে-সে বিষয়ে ওয়াশিংটন এখনো স্পষ্ট কিছু জানায়নি।
হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র আনা কেলি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সবসময় সব ধরনের সামরিক বিকল্প হাতে রাখেন।’ এই বাহিনী পাঠানোর সিদ্ধান্ত আসে এমন সময়ে, যখন প্রায় ৫,০০০ মার্কিন মেরিন নিয়ে গঠিত দুটি অ্যাম্ফিবিয়াস আক্রমণ দলও ওই অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে ৮২তম এয়ারবর্নকে কী কী মিশনে ব্যবহার করা হতে পারে তা উল্লেখ করা হয়েছে।
হরমুজ প্রণালিতে আক্রমণ: ইরান ও তাদের মিত্ররা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ধারণা করা হচ্ছে, ইরান সেখানে মাইন পেতে রেখেছে। পাশাপাশি কিছু জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে তেলের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের বেশি হয়েছে। এই প্রণালি নিয়ন্ত্রণে ইরানের প্রধান শক্তি কেশম দ্বীপ। এটি প্রণালির সবচেয়ে সরু অংশের ওপর নজর রাখে। একসময় পর্যটকদের আকর্ষণ ছিল এই দ্বীপটি, এখন তা পরিণত হয়েছে সামরিক ঘাঁটিতে। দ্বীপটির লবণগুহা ও ম্যানগ্রোভ বনের নিচে রয়েছে ‘আন্ডারগ্রাউন্ড মিসাইল সিটি’, যেখানে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র মজুত রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
এর মধ্যে রয়েছে জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র। এই টানেল নেটওয়ার্ক এত গভীরে যে প্রচলিত অস্ত্র দিয়ে তা ধ্বংস করা কঠিন। কিছু বিশ্লেষকের মতে, এটি ১,৬০০ ফুট পর্যন্ত গভীরে হতে পারে। ইরান এখান থেকে প্রণালি দিয়ে যাওয়া জাহাজে হামলা চালাতে সক্ষম। পাশাপাশি দ্বীপের ছোট-ছোট বন্দর থেকে দ্রুতগতির নৌযান ও ড্রোন হামলাও চালানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এই কারণে যুক্তরাষ্ট্র ৮২তম এয়ারবর্নকে ব্যবহার করতে পারে এই হুমকি মোকাবিলায় এবং প্রণালি থেকে ইরানের নিয়ন্ত্রণ সরাতে।
ব্রিটিশ সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের সাবেক কর্নেল ফিল ইনগ্রাম বলেন, ‘সামরিকভাবে এটি তুলনামূলক সহজ মনে হলেও বাস্তবে এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং প্রাণহানির সম্ভাবনা অনেক।’ তিনি বলেন, প্রথমে ব্যাপক বিমান হামলার মাধ্যমে দ্বীপটির প্রতিরক্ষা দুর্বল করতে হবে। এরপর প্যারাট্র–পাররা নেমে গুরুত্বপূর্ণূ ঘাঁটি দখল বা টানেল নেটওয়ার্কে অভিযান চালাতে পারে। একই সময়ে অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ও এ-১০ ওয়ারথগ যুদ্ধবিমান অতিরিক্ত সহায়তা দিতে পারে। ৩১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট প্রায় ২,২০০ মেরিন ও সাঁজোয়া যান নিয়ে সমুদ্রপথে হামলা চালাতে পারে।
খারগ দ্বীপ দখল : আরেকটি সম্ভাব্য লক্ষ্য খারগ দ্বীপ, যা কেশম থেকে প্রায় ৩০০ মাইল উত্তরে অবস্থিত। এটি ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র, যেখানে দেশের অধিকাংশ অপরিশোধিত তেল রপ্তানি হয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি দ্বীপটি দখলের কথা বিবেচনা করছেন, যা ইরানের ওপর বড় অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করবে। ৮২তম এয়ারবর্ন প্রথম ধাপে প্যারাসুটে নেমে দ্বীপটির বিমানঘাঁটি দখল করতে পারে এবং পরবর্তী বাহিনীর জন্য অবস্থান তৈরি করতে পারে। তবে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো-মেরিন বাহিনীকে হরমুজ অতিক্রম করে সেখানে পৌঁছাতে হবে, যা ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঝুঁকিতে থাকবে।
রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের সামরিক বিশেষজ্ঞ ম্যাথিউ সাভিল বলেন, ‘এই সংকীর্ণ পথে জাহাজগুলো সহজ লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠবে।’
ইউরেনিয়াম দখল: সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এবং কম সম্ভাবনাময় পরিকল্পনা হলো ইরানের অভ্যন্তরে ঢুকে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দখল করা। ২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছিল, তারা ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ধ্বংস করেছে। এর আগে নাতাঞ্জ ও ফোরদোতে প্রধান ইউরেনিয়াম মজুত ছিল। তবে সেগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। বর্তমানে ইরান নতুন স্থাপনা তৈরি করছে। ৮২তম এয়ারবর্নকে এসব স্থানে পাঠিয়ে ইউরেনিয়াম দখল করার চেষ্টা করা হতে পারে, যার ওজন প্রায় ১,০০০ পাউন্ড বলে ধারণা করা হয়।
ফিল ইনগ্রাম বলেন, ‘এটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ এবং তেমন লাভজনক নয়। যদি জানা যায় ইউরেনিয়াম মাটির নিচে আছে, তবে বোমা মেরে সেটিকে সেখানেই আটকে রাখা যায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘স্থলবাহিনী পাঠিয়ে তা উদ্ধার করা অত্যন্ত বিপজ্জনক। আমেরিকা হয়তো পারবে, কিন্তু সেখানে শক্ত প্রতিরক্ষা থাকবে এবং ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কা থাকবে।’
প্রকাশক : সোহেল রানা সম্পাদক: আব্দুস সামাদ সায়েম
©২০১৫-২০২৫ সর্বস্ত্ব সংরক্ষিত । তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় কর্তৃক নিবন্ধনকৃত (নিবন্ধন নং-২১০)