
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে মার্কিন আধিপত্য ছিল অবিসংবাদিত। ওয়াশিংটনের দাবি ছিল, তাদের স্টিলথ প্রযুক্তি এবং অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সামনে যেকোনো শত্রু অসহায়। কিন্তু সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি এক ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। ইরান একের পর এক মার্কিন উচ্চপ্রযুক্তির সামরিক সম্পদ ধ্বংস করে বিশ্বকে চমকে দিয়েছে, যা পেন্টাগনের তথাকথিত ‘অপরাজেয়’ ইমেজের মূলে কুঠারাঘাত করেছে।
ইরানি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন সম্পদের তালিকাটি দীর্ঘ এবং অত্যন্ত ব্যয়বহুল। জানা গেছে, জর্ডানের মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে থাকা প্রায় ৩০ কোটি ডলার মূল্যের থাড প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সৌদি আরবে অবস্থিত অত্যন্ত শক্তিশালী ই-৩ সেন্ট্রি রাডার বিমান ইরানি নিশানায় পরিণত হয়েছে। এছাড়াও আকাশপথের ত্রাস হিসেবে পরিচিত এফ-৩৫ লাইটনিং-টু এবং এফ-১৫ ই-এর মতো যুদ্ধবিমানও ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের হাত থেকে রক্ষা পায়নি।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ইরান গত ৪৭ বছর ধরে এই যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েছে। তারা কেবল প্রচলিত যুদ্ধের ওপর নির্ভর না করে ‘অপ্রতিসম যুদ্ধকৌশল’ এবং ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে মার্কিন প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতাগুলো ফাঁস করে দিচ্ছে। আমেরিকার অতি-প্রযুক্তি নির্ভরতার সুযোগ নিয়ে ইরান তাদের নিজস্ব ডিস্ট্রিবিউটেড লেয়ার্ড এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম ব্যবহার করছে, যা মার্কিন রাডারকেও ফাঁকি দিতে সক্ষম হচ্ছে।
এই যুদ্ধে ইরানের অভাবনীয় সাফল্যের পেছনে বিদেশি শক্তির সহায়তার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক জলসীমায় অবস্থানরত চীনা জাহাজ 'লিয়াওয়াং-১' নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। ওমান উপকূলে স্থির হয়ে থাকা এই জাহাজটি একটি ভাসমান সুপারকম্পিউটারের মতো কাজ করছে।
অভিযোগ উঠেছে, এটি এই অঞ্চলের সমস্ত ইলেকট্রোম্যাগনেটিক সিগন্যাল সংগ্রহ করে ইরানকে নিখুঁতভাবে মার্কিন লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে সাহায্য করছে।
চীনা সহায়তার পাশাপাশি রাশিয়ার ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদিও ক্রেমলিন আনুষ্ঠানিকভাবে অস্বীকার করেছে। তবে বিভিন্ন গোয়েন্দা রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে যে রাশিয়া ইরানকে এস-৪০০ এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমের পাশাপাশি স্যাটেলাইট ইমেজারি এবং গুরুত্বপূর্ণ টার্গেটিং ডেটা সরবরাহ করছে। রুশ গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহারের ফলেই ইরান বাগদাদে মার্কিন দূতাবাসের সুরক্ষিত হেলিপ্যাডে নিখুঁত হামলা চালাতে সক্ষম হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মজার বিষয় হলো, প্রযুক্তির এই লড়াইয়ে ‘ওপেন সোর্স’ ডেটাও বড় ভূমিকা রাখছে। চীনা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান 'মিজারভিশন' মার্কিন সেনা চলাচলের উচ্চ-রেজোলিউশন ভিডিও সরবরাহ করছে, যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে। এর ফলে মার্কিন গোপনীয়তা আর বজায় থাকছে না। পেন্টাগন সবকিছু বুঝলেও বেইজিং বা মস্কোর সাথে সরাসরি সংঘাতের আশঙ্কায় কঠোর কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছে না।
যুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতির তালিকায় আরও রয়েছে এ-১০ থান্ডারবোল্ট, এফ-১৬ ফ্যালকন এবং বেশ কিছু কেসি-১৩৫ স্ট্র্যাটো ট্যাঙ্কার বিমান। ইরান এবং ইরাক সীমান্তে এই বিমানগুলোর পতন মার্কিন বিমানবাহিনীর শ্রেষ্ঠত্বকে বড় ধরণের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। বিশেষ করে পারস্য উপসাগরে মার্কিন আধিপত্য এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি নড়বড়ে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রকাশক : সোহেল রানা সম্পাদক: আব্দুস সামাদ সায়েম
©২০১৫-২০২৫ সর্বস্ত্ব সংরক্ষিত । তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় কর্তৃক নিবন্ধনকৃত (নিবন্ধন নং-২১০)