
মিশেল ও লাভিনিয়া ওসবোর্ন—যমজ বোন। জন্ম থেকে একে অপরের সঙ্গে আত্মার টান। কিন্তু ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে একটি ই-মেইল বদলে দেয় তাদের আজীবনের চেনা পৃথিবী। ডিএনএ পরীক্ষার সেই ফলাফল দেখে লাভিনিয়ার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যায়।
পরীক্ষায় বেরিয়ে আসে এক বিস্ময়কর তথ্য। যমজ বোন মিশেল ও লাভিনিয়ার বাবা এক নন। তারা একই মায়ের গর্ভে বেড়ে উঠেছেন, একই সঙ্গে ভূমিষ্ঠ হয়েছেন, কিন্তু তারা আসলে সৎ বোন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় অত্যন্ত বিরল এ ঘটনার নাম ‘হেটারোপ্যাটারনাল সুপারফেকান্ডেশন’ (Heteropaternal superfecundation)।
সাধারণত এক ঋতুচক্রে কোনো নারীর শরীরে একাধিক ডিম্বাণু তৈরি হলে এবং অল্প সময়ের ব্যবধানে ভিন্ন ভিন্ন পুরুষের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কের ফলে ওই ডিম্বাণুগুলো নিষিক্ত হলে এমন ঘটনা ঘটতে পারে। বিশ্বজুড়ে এ পর্যন্ত এমন মাত্র ২০টি ঘটনার প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিবিসি রেডিও ৪-এর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মিশেল ও লাভিনিয়াই যুক্তরাজ্যের প্রথম নথিভুক্ত যমজ, যাদের বাবা আলাদা।
৪৯ বছর বয়সী লাভিনিয়ার কাছে এ সত্য ছিল যন্ত্রণাদায়ক। তিনি বলেন, ‘ও-ই (মিশেল) ছিল আমার একমাত্র নিশ্চিত আশ্রয়। হুট করে মনে হলো, সেই ধ্রুব সত্যটাই আর নেই।’ তবে মিশেল ছিলেন শান্ত। তার ভাষ্য, ‘আমি অবাক হইনি। এটা অদ্ভুত ও বিরল, কিন্তু আমার কাছে বিষয়টির একটা মানে দাঁড়িয়েছে।’
১৯৭৬ সালে নটিংহামে যখন এ যমজদের জন্ম হয়, তখন তাদের মা ছিলেন মাত্র ১৯ বছরের এক তরুণী। শৈশবে মায়ের কাছে খুব একটা আদর পাননি তারা। পাঁচ বছর বয়সে মা তাদের ফেলে লন্ডনে পড়তে চলে যান। এক ‘নানি’র (মায়ের বন্ধুর মা) কাছে বড় হন তারা।
মিশেল বলেন, ‘আমরা দুই বোনই ছিলাম বাইরের দুনিয়ার বিরুদ্ধে লড়ার একমাত্র শক্তি।’ কৈশোরে ‘জেমস’ নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে তাদের পরিচয় হয়, যাকে তাদের মা বাবা বলে পরিচয় দিয়েছিলেন। কিন্তু মিশেলের মনে সবসময়ই খটকা ছিল। ২০২১ সালে মায়ের স্মৃতিভ্রম (ডিমেনশিয়া) রোগ ধরা পড়লে সত্য জানার কোনো উপায় থাকে না। এরপরই মিশেল ডিএনএ পরীক্ষার কিট কেনেন।
২০২২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি, যেদিন তাদের মা মারা যান, সেদিনই পরীক্ষার ফল আসে। দেখা যায়, মিশেলের বাবা জেমস নন। অনুসন্ধানে মিশেল জানতে পারেন- তার আসল বাবা ‘অ্যালেক্স’ নামের এক ব্যক্তি, যিনি মাদকাসক্ত হয়ে রাস্তায় জীবন কাটাতেন।
অন্যদিকে লাভিনিয়া প্রথমে দ্বিধায় থাকলেও পরে নিজের ডিএনএ পরীক্ষা করান। দেখা যায়, জেমস তারও বাবা নন। লাভিনিয়ার বাবা আসলে ‘আর্থার’ নামের এক ব্যক্তি।
লাভিনিয়া এখন তার বাবা আর্থারের খুব কাছে থাকেন। আর্থারও দুই বোনকেই আপন করে নিয়েছেন। আর্থারের সঙ্গে কথা বলে তারা জানতে পারেন, কঠিন এক বিপদের মুহূর্তে তাদের মা আর্থারের কাছে সাহায্য চাইতে গিয়ে গর্ভবতী হয়েছিলেন। মিশেলও তার জৈবিক বাবা অ্যালেক্সের দেখা পেয়েছেন, তবে তার সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে চাননি তিনি।
মায়ের মনে এ রহস্য ছিল কিনা, তা আর কোনোদিন জানা যাবে না। তবে যমজ এ বোনেরা মনে করেন, ডিএনএ তাদের পরিচয় আলাদা করে দিলেও তাদের আত্মার বাঁধন ছিঁড়তে পারবে না। লাভিনিয়া বলেন, ‘আমরা অলৌকিক কিছুর অংশ। আমাদের ঘনিষ্ঠতা কোনোদিন ভাঙবে না।’ মিশেলের কণ্ঠেও একই সুর, ‘ও আমার যমজ বোন, কোনো কিছুই এ সত্য পালটাতে পারবে না।’
সূত্র: বিবিসি।
প্রকাশক : সোহেল রানা সম্পাদক: আব্দুস সামাদ সায়েম
©২০১৫-২০২৫ সর্বস্ত্ব সংরক্ষিত । তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় কর্তৃক নিবন্ধনকৃত (নিবন্ধন নং-২১০)