যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তজনা এবং হরমুজ প্রণালী ঘিরে উদ্ভূত অস্থিরতায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আবারো ঊর্ধ্বমুখী। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও যুদ্ধের আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে তেলের আন্তর্জাতিক সূচকে। বৃহস্পতিবার লেনদেনের শুরুতে অপরিশোধিত তেলের বাজার যথেষ্ট অস্থিতিশীল ছিল এবং দিন বাড়ার সাথে সাথে দামের গ্রাফ ওপরের দিকে উঠতে দেখা যায়।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হিসেবে পরিচিত ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারসের জুলাই দাম শূন্য দশমিক ৬৭ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১০১ দশমিক ৯৫ ডলারে পৌঁছেছে। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই ক্রুড ফিউচারসের জুন মাসের দাম শূন্য দশমিক ৬৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি ব্যারেল ৯৫ দশমিক ৭০ ডলারে দাঁড়িয়েছে। বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দুই দেশের মধ্যে চলমান এই স্নায়ুযুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে তেলের বাজার আরো অস্থির হয়ে উঠতে পারে।
সিটির মার্কিন ইকুইটি স্ট্র্যাটেজিস্ট স্কট ক্রোনার্ট এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, এই সংঘাতের স্থায়িত্ব সরাসরি বিশ্ব অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলবে। তার মতে, তেলের উচ্চমূল্য যদি দীর্ঘ সময় বজায় থাকে তবে তা ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশাকে বাধাগ্রস্ত করবে। এছাড়া মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার সংক্রান্ত সিদ্ধান্তেও এটি বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
সম্প্রতি ওয়াশিংটন এবং তেহরান একটি শান্তি চুক্তির দ্বারপ্রান্তে রয়েছে বলে বিভিন্ন মহলে খবর ছড়িয়ে পড়েছিল। তবে সেই গুঞ্জনের মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার এক বিতর্কিত মন্তব্য করে বসেন। তিনি সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ইরান যদি দ্রুত একটি শান্তি চুক্তিতে সম্মত না হয়, তবে দেশটিতে এর আগে যে মাত্রায় বোমা হামলা চালানো হয়েছিল, তার চেয়েও অনেক বড় পরিসরে হামলা চালানো হবে।
ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পর বাজার সংশ্লিষ্টদের মনে নতুন করে আশঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে যে, দুই দেশের মধ্যকার শান্তি আলোচনা এখনো বেশ ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্প স্পষ্ট করেন যে, ইরান যদি তাদের প্রস্তাবিত শর্তাবলী মেনে নেয় তবেই চলমান 'অপারেশন এপিক ফিউরি'র সমাপ্তি ঘটবে। শান্তি চুক্তি কার্যকর হলে ওমান উপসাগরে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার করা হবে এবং হরমুজ প্রণালী সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হুমকির প্রতিক্রিয়ায় ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, তেহরান এখনো প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করছে। তিনি বলেন, পাকিস্তানসহ মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরান তাদের আনুষ্ঠানিক জবাব দেবে। তবে বাঘাই তার এক পোস্টে আন্তর্জাতিক আদালতের উদ্ধৃতি দিয়ে পরোক্ষভাবে মার্কিন অবস্থানকে কটাক্ষ করেছেন। তার মতে, আলোচনা মানে কখনোই একপাক্ষিক একনায়কত্ব বা জবরদস্তি নয়, বরং এতে সদিচ্ছার প্রতিফলন থাকতে হবে।
ওমানে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্ক সিভার্স মনে করেন, এই মুহূর্তে সবার মূল লক্ষ্য হলো হরমুজ প্রণালীকে সম্পূর্ণভাবে উন্মুক্ত করা। বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের একটি বিশাল অংশ এই রুট দিয়ে পরিবাহিত হয়, যা বর্তমানে উত্তেজনার কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্য সচল রাখতে এবং জ্বালানি ট্যাংকারগুলোর অবাধ চলাচল নিশ্চিত করতে হলে কোনো প্রকার শর্ত বা মাশুল ছাড়াই এই পথটি দ্রুত খুলে দেওয়া প্রয়োজন।
সূত্র: সিএনবিসি
প্রকাশক : সোহেল রানা সম্পাদক: আব্দুস সামাদ সায়েম
©২০১৫-২০২৫ সর্বস্ত্ব সংরক্ষিত । তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় কর্তৃক নিবন্ধনকৃত (নিবন্ধন নং-২১০)