বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারে মাদকের বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়েছে। এবং এই অবৈধ বাণিজ্যের সাথে জড়িয়ে পড়েছেন খোদ দুইজন ডেপুটি জেলারসহ কজন কারারক্ষী।
গত ১০ জুন জনৈক নারী বন্দি সুবর্ণার কাছ থেকে মাদকের একটি বড় চালান উদ্ধারের পর কারাগারের ভেতরে মাদক কারবারের বিষয়টি তুমুল আলোচনায় আসে। কঠোর নিরাপত্তা বলয় ভেদ করে কারাভ্যন্তরে মাদকের চালান প্রবেশ এবং বন্দিদের কাছ থেকে উদ্ধারের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট প্রশাসনেও তোলপাড় চলছে।
সূত্র বলছে, বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারে অনিয়ম এবং দুর্নীতির শেষ নেই, সর্বক্ষেত্রেই আইন লঙ্ঘন করা হচ্ছে। বিপদজনক বন্দিদের কাছ থেকে সুবিধাগ্রহণ করে তাদের বিভিন্ন সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ আছে।
এবার নারী বন্দি সুবর্ণার কাছ থেকে ২১৫ পিস ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনাটি বেশিমাত্রায় আলোচিত হচ্ছে এবং এই ঘটনা দুজন ডেপুটি জেলার সুমাইয়া ও আনন্দ শীলকে বেকায়দায় ফেলে দিয়েছে।
এর আগে গত ৬ জুন কারাভ্যন্তরের কীর্তনখোলা-২ ভবনের বন্দি সুমন খানের কাছ থেকে ১০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। অভিযোগ, কাছাকাছি সময়ে দুটি ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনা অর্থের বিনিময়ে কারা কর্তৃপক্ষ লুকোচাপা রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু এই মাদক বাণিজ্যে দুইজন কর্মকর্তাসহ কারারক্ষীরা জড়িত থাকায় বিষয়টি বেশ কৌতুহলের সৃষ্টি করে।
কারা কর্তৃপক্ষ এই মাদককান্ডে বন্দি সুবর্ণার বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া এবং কারারক্ষী মৌ ও শারমিন নামের দুজনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাগ্রহণের কথা জানিয়েছেন। পাশাপাশি কর্মকর্তা জড়িত থাকার বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে।
সূত্রগুলো জানিয়েছে, কারাভ্যন্তরের এই মাদক বাণিজ্যে শুধু রক্ষীরাই জড়িত নয়, সম্পৃক্ত আছেন ডেপুটি জেলার সুমাইয়া এবং আনন্দ শীল। তাদের সাথে আরও জড়িত আছেন সর্বপ্রধান কারারক্ষী বাদল কবির মৃধা, কারারক্ষী গাজী রশিদ, হানিফ, গেটরক্ষী ফিরোজ আলম এবং গেট সার্জেন্ট মাইনুল।
একাধিক সূত্রের দাবি কারাগারের মূল ফটকে ‘রাখিব নিরাপদ, দেখাব আলোর পথ’ এমন শ্লোগান লেখা থাকলেও অভ্যন্তরের অনিয়ম-দুর্নীতির অন্ত নেই। দুই ডেপুটি জেলার সুমাইয়া এবং আনন্দ শীল গোটা কারাগারকে অনিয়ম-দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করেছেন। মাস শেষে মোটা অংকের উৎকোচের বিনিময়ে রক্ষীদের সহযোগিতায় বন্দিদের মাদকে জড়াতে সহযোগিতা করছেন।
এনিয়ে গত কয়েকদিন ধরে কারারক্ষীদের বড় একটি অংশ নিরব বিদ্রোহ শুরু করেছেন এবং এই অনৈতিক কাজে জড়িতদের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। কিন্তু কারা কর্তৃপক্ষ বিষয়টি ধামাচাপা দিতে নানা কৌশল অবলম্বন করছে।
নামপ্রকাশ না করার শর্তে কারাগারের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, গত ৬ জুন কীর্তনখোলা-২ ভবন থেকে সুমন খান নামের বন্দির কাছ থেকে ১০ পিস ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনাটি দুই ডেপুটি জেলার সুমাইয়া এবং আনন্দ শীলের নির্দেশনায় ২০ হাজার টাকায় আপস করেন সর্বপ্রধান রক্ষী (ভেতর সুবেদার) গাজী রশিদ ও প্রধান রক্ষী মো. শহিদুল ইসলাম। এই দুই রক্ষী কারাভ্যন্তরে গোয়েন্দা কাজে নিয়োজিত বলে জানা গেছে। এই বিষয়ে জানতে তাদের মধ্যেকার গাজী রশিদকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি তার রিসিভ করেননি।
সূত্র জানিয়েছে, কীর্তনখোলা ভবনের ঘটনাটি যে ভাবে অর্থের বিনিময়ে লুকায়িত রাখা হয়, একইভাবে ১০ জুন নারী বন্দি সুবর্ণার কাছ থেকে ২৫ পিস ইয়াবা উদ্ধারের বিষয়টিও ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। এবং এনিয়ে কদিন ব্যাপক দর কষাকষিও হয়, কিন্তু শেষত্বক পরিবেশ-পরিস্থিতি ডেপুটি জেলার সুমাইয়া এবং আনন্দ শীলের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
এই ঘটনায় ডেপুটি জেলার আনন্দ শীলকে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও অপরপ্রান্ত থেকে কোনো সাড়া মেলেনি। তবে ডেপুটি জেলার সুমাইয়া ফোন ধরে প্রশ্ন শুনেই ব্যস্ত আছেন এবং পরে যোগাযোগ করছেন জানিয়ে কলটি রেখে দেন। পরবর্তীতে তিনি আর এ প্রতিবেদককে ফোন করেননি।
তবে জেল সুপার সুব্রত কুমার বালা বন্দিদের কাছ থেকে মাদক উদ্ধারের ঘটনাটি এ প্রতিবেদকের কাছে স্বীকার করেছেন। এবং তিনি বলছেন, বন্দি সুবর্ণার নামে মামলা করতে জেলার মাহাবুব কবিরকে নির্দেশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি এই ঘটনায় মৌ এবং শারমিন নামের দুজন রক্ষীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থাগ্রহণে সুপারিশ রাখা হয়েছে।
কঠোর নিরাপত্তা বলয় ভেদ করে কারাভ্যন্তরে কি ভাবে মাদকের চালান ঢুকছে এবং এর সাথে দুজন ডেপুটি জেলারের সম্পৃক্ততার যে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, সেই বিষয়ে জেল সুপার বলছেন, বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে। সেই সাথে কারাগারকে মাদকমুক্ত করাসহ অনিয়ম-দুর্নীতি রোধে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারের বন্দিদের কাছ থেকে এর আগেও একাধিকবার মাদক এবং স্মার্ট মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়।
৫ আগস্টপরবর্তী বন্দি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের এই ধরনের সুবিধা দেওয়া হয়। তখন দৈনি রূপালী বাংলাদেশ পত্রিকায় মোটা দাগে একটি সংবাদ প্রকাশের পরে বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়। সেই সময় বিতর্ক এড়াতে জেলা প্রশাসন কারাগারে অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকটি স্মার্ট মোবাইল ফোনসহ মাদকদ্রব্য উদ্ধার করেছিল।
এবার খোদ নারী বন্দির কাছ থেকে ২১৫ পিস ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনা ঘটল।
প্রকাশক : সোহেল রানা সম্পাদক: আব্দুস সামাদ সায়েম
©২০১৫-২০২৫ সর্বস্ত্ব সংরক্ষিত । তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় কর্তৃক নিবন্ধনকৃত (নিবন্ধন নং-২১০)