মানুষের বয়স বাড়ার গতি কমিয়ে দিতে পারে এবং আয়ু বাড়িয়ে দিতে পারে—এমন এক ওষুধ আবিষ্কারের ‘দাবি’ করেছেন জাপানের একদল বিজ্ঞানী। এই খবর প্রকাশের পর থেকেই বৈজ্ঞানিক মহলে যেমন তুমুল চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে, তেমনি বিষয়টি নিয়ে তৈরি হয়েছে এক গভীর ধোঁয়াশা ও বিতর্ক।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ‘জাপান টাইমস’-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, জাপানের টোকিও ইউনিভার্সিটি ও কিয়োটো বায়োসায়েন্স ইনস্টিটিউটের যৌথ গবেষণায় ‘এনআরএক্স-৫১’ (NRX-51) নামের এই বিশেষ ওষুধটি উদ্ভাবন করা হয়েছে। বিজ্ঞানীদের দাবি, এই ওষুধটি মূলত কোষের ভেতরে থাকা মাইটোকন্ড্রিয়ার বয়স বাড়ার প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয়।
সাধারণত বয়স বাড়ার সাথে সাথে মানবদেহের কোষে শক্তি উৎপাদনের হার কমে যায়, ফলে শরীর দুর্বল হতে থাকে। ‘সায়েন্স অ্যালার্ট’-এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘এনআরএক্স-৫১’ মূলত মানবদেহে উপস্থিত ‘এসআইআরটি-৬’ (SIRT6) নামের এক বিশেষ প্রোটিনের কার্যকারিতা কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়, যা কোষের ডিএনএ মেরামত এবং কোষ বিভাজন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। গবেষকদের দাবি, এই ওষুধ জিন বা ডিএনএ পরিবর্তন করে না, বরং দেহের নিজস্ব প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াকেই দীর্ঘায়িত করে তোলে। ফলে বার্ধক্যজনিত রোগ যেমন—পারকিনসন্স, ডিমেনশিয়া বা হৃদরোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।
তবে বিজ্ঞানীদের এই আকাশচুম্বী দাবি নিয়ে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারছেন না বিশেষজ্ঞরা। ‘বিবিসি ফিউচার’-এর একটি বিশ্লেষণে সতর্ক করে বলা হয়েছে, মানুষের আয়ু স্বাভাবিকের চেয়ে বৃদ্ধি পেলে পৃথিবীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়তে পারে। অস্বাভাবিক জনসংখ্যা বৃদ্ধি, খাদ্য ও পানি সংকট, কর্মসংস্থানের জটিলতা এবং ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য আকাশচুম্বী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তাছাড়া, ওষুধটির কার্যকারিতা ও সহজলভ্যতা নিয়েও রয়ে গেছে বড় প্রশ্ন ও ধোঁয়াশা। বর্তমানে এটি শুধুমাত্র গবেষণাগার বা প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। গবেষকদের ধারণা, এটি বাজারে আসলে প্রাথমিকভাবে প্রতিটি কোর্সের দাম হতে পারে প্রায় ২ থেকে ৩ লাখ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকার সমান। ফলে প্রথম দিকে কেবল অতি ধনী শ্রেণীই এর সুবিধা নিতে পারবে, যা এক নতুন সামাজিক বৈষম্য তৈরি করবে।
অনেক নীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানী প্রশ্ন তুলছেন, মৃত্যু যেখানে জীবনের স্বাভাবিক চক্র সম্পূর্ণ করে, সেখানে এই চক্রে হস্তক্ষেপ করা কতটা যৌক্তিক? বিজ্ঞানীদের একাংশ অবশ্য আশাবাদী যে এটি অমরত্ব না দিলেও বার্ধক্যের কষ্ট কমাবে। তবে এই ‘এনআরএক্স-৫১’ সত্যিই মানব সভ্যতায় নতুন স্বর্ণযুগ আনবে নাকি এটি স্রেফ এক কাল্পনিক হাইপ বা বিপজ্জনক পরীক্ষার সূচনা—তা নিয়ে ধোঁয়াশা কাটতে আরও দীর্ঘ সময় লাগবে।
প্রকাশক : সোহেল রানা সম্পাদক: আব্দুস সামাদ সায়েম
©২০১৫-২০২৫ সর্বস্ত্ব সংরক্ষিত । তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় কর্তৃক নিবন্ধনকৃত (নিবন্ধন নং-২১০)