আয়-রোজগারে বরকত লাভের একটি মাধ্যম হলো সাধ্য মতো মানুষকে খাওয়ানো। অনেকে মনে করে অন্যকে খাওয়ালে আমার সম্পদ কমে যাবে, অভাব নেমে আসবে, তবে বাস্তবতা ভিন্ন।
মানুষকে খাওয়ানো শুধু মানবিক সহানুভূতির প্রকাশ নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এক অনন্য পথ। কোরআন-হাদিসে মানুষকে খাওয়ানোর যে ফজিলত বর্ণিত হয়েছে, তা পাঠ করলে মনে হয়— এই একটি আমলের মধ্যে দুনিয়া ও আখিরাতের বহু কল্যাণ নিহিত।
হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, একবার এক ব্যক্তি রাসুল (সা.)-এর কাছে জিজ্ঞেস করেন, ইসলামের কোন কাজটি সবচেয়ে উত্তম? উত্তরে তিনি বলেন, ‘তুমি মানুষকে খাবার খাওয়াবে আর তোমার পরিচিত-অপরিচিত সকলকেই সালাম দেবে।’ (বুখারি, হাদিস : ১২)
এই হাদিস দ্বারা বোঝা যায়, মানুষকে খাওয়ানো বদ অভ্যাস নয়, বরং মহানবী (সা.) এই কাজকে ইসলামের শ্রেষ্ঠ আমল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
হ্যাঁ, প্রতিদিন অন্যকে ভালো খাবার খাওয়ানোর সামর্থ্য হয়তো সবার নেই; বেশির ভাগ মানুষেরই অভাব-অনটন ও টানাপড়েন আছে, এগুলোর ভেতরও যদি কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় সাধ্য মতো কারো ক্ষুধা নিবারণের চেষ্টা করে, তবে তার জন্য মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে পুরস্কারের ঘোষণা রয়েছে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তারা আল্লাহর ভালোবাসায় মিসকিন, এতিম ও বন্দিদের খাবার দান করে। (এবং তাদেরকে বলে) আমরা তো তোমাদেরকে খাওয়াই কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে। আমরা তোমাদের কাছে কোন প্রতিদান চাই না এবং কৃতজ্ঞতাও না।
আমরা তো আমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে ভয় করি, এমন এক দিনের, যেদিন চেহারা ভীষণভাবে বিকৃত হয়ে যাবে। পরিণামে আল্লাহ তাদেরকে সেই দিনের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করবেন এবং তাদেরকে উৎফুল্লতা ও আনন্দ দান করবেন।’
(সুরা : দাহর, আয়াত : ৮-১১)
এই আয়াতে তিনটি বিষয় স্পষ্ট। প্রথমত, খাওয়ানোর উদ্দেশ্য হতে হবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি, প্রশংসা বা প্রতিদানের প্রত্যাশা নয়। দ্বিতীয়ত, নিজের প্রয়োজন থাকার পরও যদি অন্যকে খাওয়ানো যায়, সেটিই সর্বোচ্চ মর্যাদার কাজ।
তৃতীয়ত, এর পুরস্কার দুনিয়ায় নয়, কিয়ামতের সেই ভয়ানক দিনে, আল্লাহ নিজে তাদের বিপদ থেকে রক্ষা করবেন এবং জান্নাত দেবেন। সুবহানাল্লাহ!
এই পুরস্কারের অধিকারী হতে অনেক টাকা খরচ করে বড় জিয়াফত খাওয়ানো শর্ত নয়। সামর্থ্য অনুযায়ী খুব অল্প মূল্যের খাবারই জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তির মাধ্যম হয়ে যেতে পারে। আদি ইবনে হাতিম (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘আমি মহানবী (সা.)-কে বলতে শুনেছি, তোমরা জাহান্নাম হতে আত্মরক্ষা করো এক টুকরা খেজুর সদকা করে হলেও।’ (বুখারি, হাদিস : ১৪১৭)
এই হাদিস থেকে স্পষ্ট, দান-সদকায় আল্লাহর কাছে সব সময় পরিমাণ বড় নয়, বরং নিয়ত ও আন্তরিকতা বড়। বিশুদ্ধ নিয়তে সামান্য খাবার সদকা করেও জাহান্নাম থেকে মুক্তির পথ বের করা যায়।
এ ছাড়া আয়-রোজগারে বরকত লাভের অন্যতম চাবিকাঠি হলো দান ও মানুষকে খাওয়ানো। দান-সহযোগিতায় বরকত নেমে আসে। অনেক হাদিসে এটি প্রমাণিত যে দানের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা বিপদ-মুসিবত দূর করে দেন।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘বলো, নিশ্চয়ই আমার রব তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার জন্য ইচ্ছা রিজিক প্রশস্ত করেন এবং সংকুচিত করেন। আর তোমরা যা কিছু আল্লাহর জন্য ব্যয় করো তিনি তার বিনিময় দেবেন এবং তিনিই উত্তম রিজিকদাতা।’ (সুরা : সাবা, আয়াত : ৩৯)
হাদিস শরিফে এসেছে, আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘প্রতিদিন সকালে দুজন ফেরেশতা অবতরণ করেন। তাঁদের একজন বলেন, হে আল্লাহ! দাতাকে তার দানের উত্তম প্রতিদান দিন আর অপরজন বলেন, হে আল্লাহ! কৃপণকে ধ্বংস করে দিন।’
(বুখারি, হাদিস : ১৪৪২)
অতএব, আমাদের উচিত সাধ্য মতো মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় মানুষকে খাওয়ানোর চেষ্টা করা, বিশেষ করে গরিব-দুঃখী ও অভাবী মানুষের পাশে দাঁড়ানো। ইনশাআল্লাহ, এর মাধ্যমে মহান আল্লাহ আমাদের দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা, শান্তি ও বরকত দান করবেন।
প্রকাশক : সোহেল রানা সম্পাদক: আব্দুস সামাদ সায়েম
©২০১৫-২০২৫ সর্বস্ত্ব সংরক্ষিত । তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় কর্তৃক নিবন্ধনকৃত (নিবন্ধন নং-২১০)