কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিকে প্রশিক্ষণ দিতে বিপুলসংখ্যক বই সংগ্রহ, স্ক্যান এবং পরে ধ্বংস করার অভিযোগ ঘিরে উদ্বেগ বাড়ছে দুর্লভ ও পুরোনো বইয়ের বিক্রেতাদের মধ্যে। তাঁদের আশঙ্কা, মূল্যবান ও বিরল বই এভাবে নষ্ট হলে ভবিষ্যতে সেগুলোর অস্তিত্বই হারিয়ে যেতে পারে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদালতের নথি থেকে জানা যায়, এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকের বিরুদ্ধে লেখকেরা ‘ধ্বংসাত্মক স্ক্যানিং’ পদ্ধতি ব্যবহারের অভিযোগ করেছিলেন। এ পদ্ধতিতে ছাপা বইয়ের বাঁধাইয়ের অংশ কেটে পাতাগুলো আলাদা করে দ্রুত স্ক্যান করা হয়। পরে বইয়ের অবশিষ্ট অংশ ফেলে দেওয়া হয়।
আদালত অবশ্য এই প্রক্রিয়াকে যুক্তরাষ্ট্রের কপিরাইট আইনের অধীনে বৈধ বলে রায় দিয়েছেন। আদালতের বিবেচনায় এটি ‘রূপান্তরমূলক ব্যবহার’ হিসেবে গণ্য হয়েছে।
এই ঘটনা সামনে আসার পর অস্ট্রেলিয়ার পুরোনো বইয়ের বিক্রেতারাও নিজেদের ব্যবসা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। তাদের কেউ কেউ এমন ক্রয়াদেশ পেয়েছেন, যেগুলো তাঁদের স্বাভাবিক ক্রেতাদের আচরণের সঙ্গে মেলে না।
অস্ট্রেলিয়ার কয়েকজন পুরোনো বই বিক্রেতা জানিয়েছেন, কানাডাভিত্তিক জুম বুকস নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে তাঁরা বিপুলসংখ্যক বইয়ের অর্ডার পেয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের বই পুনর্ব্যবহারকারী হিসেবে পরিচয় দেয়।
ভিক্টোরিয়ার বেনাল্লায় ‘গুড রিডিং সেকেন্ডহ্যান্ড বুকস’ পরিচালনা করেন ডেলফিনা ম্যানর। তিনি জানান, মে মাসে জুম বুকসের কাছ থেকে এমন একটি অর্ডার পেয়েছিলেন, যাতে তিন বাক্স বই ছিল। প্রায় ৩০ থেকে ৪০টি বইয়ের ওই অর্ডার সংগ্রহ, প্যাকেট করা ও পাঠাতে গিয়ে তাকে বড় ধরনের ঝামেলায় পড়তে হয়।
মেলবোর্নের ‘সেইন্সবারিজ বুকস’-এর মালিক জন সেইন্সবারিও জুম বুকসের কাছ থেকে একসঙ্গে অনেক বইয়ের অর্ডার পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। তার মতে, বইগুলো ছিল বিচিত্র ও এলোমেলো ধরনের। এর মধ্যে কম দামের বই, কয়েক দশক পুরোনো বই এবং বিভিন্ন বিষয়ের বই ছিল। ক্রেতার পক্ষ থেকে বইয়ের দাম নিয়ে কোনো দর-কষাকষিও করা হয়নি।
একটি অর্ডারে ১৯৭০-এর দশকের মাটির প্রকৌশলবিষয়ক একটি নির্দেশিকা, ২০১০ সালের নিউজিল্যান্ডের সাইক্লিং নিয়ে একটি বই, ১৯৮২ সালে প্রকাশিত অস্ট্রেলীয় কবিতার সংকলন এবং মেলবোর্নের হথর্ন এলাকার স্থানীয় ইতিহাসবিষয়ক একটি বই ছিল।
দুর্লভ বই বিক্রেতা টিম হোয়াইট বলেন, কোনো বইয়ের অসংখ্য কপি থাকলে সেটি নষ্ট হওয়ার বিষয়টি একরকম হলেও কোনো বইয়ের একটিমাত্র কপি থাকলে সেটি ধ্বংস করার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে। তাঁর মতে, বই শুধু তার ভেতরের লেখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়; বই নিজেও একটি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বস্তু।
‘গ্রান্টস বুকশপ’-এর নিক ডওয়েসের গুদামে প্রায় পাঁচ লাখ বই রয়েছে। তিনি বলেন, কেউ যদি তাঁর সব বই কিনে নিয়ে সেগুলো কেটে ফেলে, তাহলে বিষয়টি একদিকে যেমন ব্যবসায়িকভাবে লাভজনক হতে পারে, অন্যদিকে একটি বই যদি কোনো বিষয়ের একমাত্র পরিচিত কপি হয়, সেটি ধ্বংস করার অনুমতি তিনি দেবেন না।
তবে বই ধ্বংস করে অন্য কাজে ব্যবহারের ঘটনা এআই প্রতিষ্ঠানগুলোই প্রথম শুরু করেনি। কিছু ব্যবসায়ী দুর্লভ বই কিনে সেগুলো কেটে ভেতরের ছবি আলাদা করে বিক্রি করেন। দুর্লভ বই বিক্রেতা গুইনেথ টড বলেন, কোনো বই বিক্রির পর সেটির ছবিগুলো আলাদাভাবে বিক্রি হতে দেখলে তাঁর কাছে বিষয়টি খুবই কষ্টদায়ক মনে হয়।
অ্যানথ্রপিকের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানটি জুম বুকসের কাছ থেকে কখনো বই কেনেনি। তার ভাষ্য, বড় ভাষা মডেল প্রশিক্ষণের জন্য বই সংগ্রহ করা এআই শিল্পে বহুল ব্যবহৃত একটি পদ্ধতি। তবে তাঁদের কোনো তথ্য সংগ্রহ কর্মসূচিতে দুর্লভ বা প্রাচীন বই কিনে ধ্বংস করা হয় না।
অন্যদিকে জুম বুকসের মুখপাত্রও বই ধ্বংস করে ডিজিটাল রূপ দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটি পুরোনো বই সংগ্রহ করে অক্ষত অবস্থায় পুনরায় বিক্রি করে। কোনো বই আর বিক্রি করা সম্ভব না হলে সেটি দায়িত্বশীলভাবে পুনর্ব্যবহার করা হয়।
তবে জুম বুকস অক্ষত অবস্থায় কেনা বই এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ধ্বংসাত্মক স্ক্যানিংয়ের জন্য বিক্রি করেছে কি না, সে বিষয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, তাদের বাণিজ্যিক চুক্তিতে গোপনীয়তার শর্ত থাকায় ক্রেতাদের বিষয়ে তারা কোনো তথ্য প্রকাশ বা আলোচনা করতে পারে না।
প্রকাশক : সোহেল রানা সম্পাদক: আব্দুস সামাদ সায়েম
©২০১৫-২০২৫ সর্বস্ত্ব সংরক্ষিত । তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় কর্তৃক নিবন্ধনকৃত (নিবন্ধন নং-২১০)