তুরস্ক ও পাকিস্তানের সাথে সৌদি আরবের সদ্য স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে মিশরকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে তীব্র বিরোধিতা করেছে রিয়াদ। আঙ্কারার পক্ষ থেকে কায়রোকে এই চুক্তিতে নেওয়ার জন্য জোর প্রচেষ্টা চালানো হলেও সৌদি আরব সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। আলোচনা সম্পর্কে ওয়াকিফহাল সৌদি তিনটি সূত্র মিডল ইস্ট আইকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
সৌদি রাজপরিবারের এক সাবেক সিনিয়র উপদেষ্টা জানান, রিয়াদ অন্তত এই মুহূর্তে মিশরকে এই চুক্তিতে যুক্ত করতে চায়নি। রিয়াদের এই অবস্থানের নেপথ্যে রয়েছে প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সরকারের প্রতি ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ। রিয়াদের বিশ্বাস মিশর আর আগের মতো সামরিক বা কৌশলগত কোনো সুবিধা দিতে পারছে না। গত ৫ আগস্ট পবিত্র মক্কা নগরীতে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে এই ঐতিহাসিক প্রতিরক্ষা চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির শর্তানুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র আক্রমণকে বাকি দুই দেশের ওপরও আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে।
সূত্রগুলোর মতে, রিয়াদ ও কায়রোর মধ্যে তৈরি হওয়া প্রচ্ছন্ন উত্তেজনাই মিশরকে দূরে রাখার প্রধান কারণ। ২০১৩ সালের অভ্যুত্থানের পর সিসির অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় সৌদি আরব প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার আর্থিক সহায়তা দিয়ে সবচেয়ে বড় সমর্থক হিসেবে পাশে দাঁড়িয়েছিল। তবে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে কায়রোর কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত সহায়তা না পাওয়ায় রিয়াদ চরম হতাশ হয়। বিশেষ করে ইয়েমেনের হুথিদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ যুদ্ধে মিশরের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত নগণ্য ও অনির্ভরযোগ্য। একই সাথে ইরান ও মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধের সময়েও মিশরের অবস্থান রিয়াদকে হতাশ করেছে।
এছাড়া, সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) প্রতি কায়রোর অনুগত অবস্থান নিয়েও রিয়াদ চরম অস্বস্তিতে রয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ ইয়েমেনের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীদের ইউএই-র সমর্থন দেওয়াকে কেন্দ্র করে রিয়াদ ও আবুধাবির সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হয়, যা সৌদির জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি স্বরূপ। তবুও সিসি ইউএই-র সাথে ঘনিষ্ঠতা বজায় রেখেছেন। যেখানে ইরানি হামলার জবাবে মিশর আবুধাবিতে যুদ্ধবিমান পাঠিয়েছিল এবং যুদ্ধের সময় সিসি একাধিকবার ইউএই প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদের সাথে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলেন, সেখানে সৌদি আরবের জন্য এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। কায়রোর এই ধরনের আচরণ রিয়াদের মনে মিশরের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে গভীর সন্দেহের সৃষ্টি করেছে।
মিশরের এই ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করে সৌদি রাজপরিবারের সাবেক সিনিয়র উপদেষ্টা বলেন, মিশর সর্বদাই আমাদের এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল থেকেছে, কিন্তু বিনিময়ে কিছুই দেয়নি। তারা কেবল নেয় আর নেয়, প্রতিদানে কিছুই দেয় না।
অন্যদিকে আঙ্কারার অবস্থান ছিল ভিন্ন। তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান ইঙ্গিত দেন যে প্রযুক্তিগত সমস্যা সমাধান হলে কায়রো শেষ পর্যন্ত এই জোটের অংশ হতে পারে। তুর্কি সূত্রগুলো জানায়, আঙ্কারা মিশরকে এই চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবও দিয়েছিল। তবে তুরস্কের এই দাবি খণ্ডন করে সৌদি সূত্রগুলো মিশরের স্বেচ্ছায় সরে যাওয়ার ধারণাকে 'হাস্যকর' বলে অভিহিত করেছে। সাবেক ওই উপদেষ্টা জানান, সিসির আনুগত্য ও সততা নিয়ে রিয়াদের গুরুতর সংশয় রয়েছে। তুরস্ক ও পাকিস্তানের মতো সিসিকে বিশ্বাস করা যায় না বলেই তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
সামরিক সক্ষমতার বিচারেও মিশরকে তুরস্ক ও পাকিস্তানের চেয়ে পিছিয়ে রাখছে রিয়াদ। সূত্রগুলো জানিয়েছে, তুরস্কের উন্নত প্রতিরক্ষা শিল্প এবং পাকিস্তানের বিশ্বমানের অস্ত্র উৎপাদন ব্যবস্থা ও বিশাল সামরিক বাহিনী রয়েছে। অন্যদিকে মিশরের সামরিক বাহিনীর উৎপাদন ক্ষমতা মূলত বেসামরিক পণ্যের ওপর নির্ভরশীল। সৌদির এক সূত্র প্রশ্ন তুলে বলেন, একটি সামরিক বাহিনীর কাজ হওয়া উচিত নিজেদের অস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি করা, খাদ্য কারখানা তৈরি ও পরিচালনা করা নয়।
সাম্প্রতিক বিশ্লেষণগুলোতেও মিশরের আঞ্চলিক ভূমিকা সংকুচিত হওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। যেখানে ১৯৯১ সালের কুয়েত যুদ্ধে মিশর প্রধান সামরিক অংশীদার ছিল, সেখানে বর্তমানে কুয়েতও মিশরের সাথে সামরিক জোটের চেয়ে মক্কা চুক্তিতে যোগ দিতে বেশি আগ্রহী। সৌদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও মিশরকে বাদ দেওয়ার সমর্থনে ব্যাপক চর্চা চলছে। যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সাবেক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা সৌদ আল-কাহতানির নামে খোলা একটি অ্যাকাউন্টে লেখা হয়, আঞ্চলিক নিরাপত্তা রক্ষায় অংশ না নিয়ে কেবল নিজেদের সমস্যা সমাধান ও লাভবান হতে চায় এমন কারো জন্য এই জোটের দরজা খোলা নেই। যুগের পরিবর্তন ঘটেছে; এখন আর একতরফা দান বা 'আমার ভাগ্য আলাদা' বলার দিন নেই, এটি যৌথ ভাগ্যের সময়।
সূত্র: মিডলইস্ট আই
প্রকাশক : সোহেল রানা সম্পাদক: আব্দুস সামাদ সায়েম
©২০১৫-২০২৫ সর্বস্ত্ব সংরক্ষিত । তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় কর্তৃক নিবন্ধনকৃত (নিবন্ধন নং-২১০)