প্রিন্ট এর তারিখঃ অগাস্ট ২২, ২০২৬, ৭:০৭ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ অগাস্ট ২২, ২০২৬, ৫:৫৫ পি.এম

ছয় বছরের বেশি সময় ধরে কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে প্রায় ২১ কোটি টাকার চিকিৎসা সরঞ্জাম পড়ে আছে। এর কোনোটি বাক্সবন্দী, কোনোটি অযত্নে ফেলে রাখা হয়েছে। এসব সরঞ্জামের মধ্যে এখন কতটি সচল আছে, আর কতটি নষ্ট হয়ে গেছে, সেটি নিশ্চিত করে বলতে পারছে না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
ঘটনার শুরু ২০১৮-১৯ অর্থবছরে। তখন ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সরকার। ওই সময় কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের জন্য 'স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচি'র আওতায় ৩২ কোটি ১৪ লাখ ৬০ হাজার টাকার সরঞ্জাম (রোগনির্ণয়ের বিভিন্ন ধরনের যন্ত্র ও চিকিৎসা উপকরণ) কেনা হয়। দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এসব সরঞ্জাম হাসপাতালে সরবরাহও করে; কিন্তু ঝামেলা বাধে বিল দেওয়ার সময়।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহীর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স মাইক্রো ট্রেডার্স ১১৮ ধরনের এবং হারামান এন্টারপ্রাইজ ৭৫ ধরনের চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ করেছিল। দুই ঠিকাদারকে ১১ কোটি ৯৯ লাখ ৯০ হাজার টাকা বিল পরিশোধ করা হয়েছিল। বাকি ২০ কোটি ৯৪ লাখ ৭০ হাজার টাকা পরিশোধের বিষয়টি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, চিকিৎসা সরঞ্জামগুলোর মধ্যে কোনটি কীভাবে কাজ করে, তা হাসপাতালের কর্মীদের হাতে-কলমে দেখানোর কাজ তখন শুরু করেছিলেন ঠিকাদারের লোকজন; কিন্তু পুরো বিল পরিশোধ না করায় সফটওয়্যার-নির্ভর ওই সব যন্ত্র পাসওয়ার্ডের মাধ্যমে 'লক' করে দেন ঠিকাদারের লোকজন। এর পর থেকে যন্ত্রগুলো অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। হাসপাতালের নতুন ভবনের অব্যবহৃত অপারেশন থিয়েটার কমপ্লেক্স এবং বিভিন্ন বিভাগে এসব সরঞ্জাম এখন পড়ে আছে।
পড়ে থাকা চিকিৎসা সরঞ্জামগুলোর মধ্যে রয়েছে ইটিটি (এক্সারসাইজ টলারেন্স টেস্ট) মেশিন, ইকোকার্ডিওগ্রাফি (হৃদযন্ত্রের আলট্রাসাউন্ড) মেশিন, পোর্টেবল এক্স-রে, এন্ডোস্কোপি মেশিন, ইলেকট্রোসার্জিক্যাল ইউনিট (ডায়াথার্মি মেশিন), অপারেশন থিয়েটারের লাইট, ইনফিউশন পাম্প, সিরিঞ্জ পাম্প, ডিফিব্রিলেটর, পালস অক্সিমিটার, অর্থোপেডিক সেট, আর্থ্রোস্কোপ ও ডপলার হার্ট ডিটেক্টর। এসব সরঞ্জাম রোগনির্ণয়সহ বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজে এবং চিকিৎসা উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
হাসপাতালের ইকোকার্ডিওগ্রাফি মেশিনের টেকনিশিয়ান মো. খাইরুল বারিয়া বলেন, কেনাকাটার পর শুরুর দিকে কিছুদিন কয়েকটি যন্ত্র চালু করেছিলেন ঠিকাদারের লোকজন। পরে হঠাৎ সব যন্ত্র 'পাসওয়ার্ড' চাওয়া শুরু হয়। এরপর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও বকেয়া বিলের কথা বলে তারা আর সহযোগিতা করেনি।
রোগনির্ণয়ের গুরুত্বপূর্ণ সব যন্ত্রপাতি ছয় বছর ধরে এভাবেই পড়ে আছে। এতে সেবাবঞ্চিত হচ্ছেন রোগীরা। সম্প্রতি কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে।
তবে প্রয়োজনীয় এসব সরঞ্জাম ব্যবহার না হওয়ায় চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে গরিব মানুষ বেশি সমস্যায় পড়ছেন।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার কাঁঠালবাড়ী এলাকার কৃষক আজগর আলী বুকে ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে এসেছিলেন। চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র নেওয়ার পর তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা হাসপাতালে করা সম্ভব হয়নি। তাঁকে বাইরে পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। সরকারি হাসপাতালে যে পরীক্ষা ২০০ টাকায় করা যায়, সেটি বেসরকারি ক্লিনিকে করাতে খরচ পড়ে প্রায় ১০০০ টাকা।
সরঞ্জামের পাশাপাশি হাসপাতালে জনবলসংকটের কারণেও চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। ১০০ শয্যার এই হাসপাতালকে ২০১৭ সালে ২৫০ শয্যায় রূপান্তর করা হয়। তবে শয্যাসংখ্যা বাড়লেও জনবলকাঠামো সে অনুযায়ী বাড়েনি।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, ৩৭১ চিকিৎসকের অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র ২০ জন। ৩৪০ জন নার্স থাকার কথা থাকলেও রয়েছেন ১৬০ জন।
হাসপাতালের বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক নূরে নেওয়াজ বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বকেয়া বিল না পাওয়ায় সরঞ্জামগুলো বুঝিয়ে দিচ্ছে না। আগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিভিন্ন গাফিলতির কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, যন্ত্রগুলো দ্রুত চালু করার জন্য সরকারের উদ্যোগ দরকার। এতে হাসপাতালে সেবা নিতে আসা হাজারো মানুষের উপকার হবে।
যন্ত্রপাতি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স মাইক্রো ট্রেডার্সের ব্যবস্থাপক মো. মিলন মিয়া বলেন, চুক্তি অনুযায়ী পুরো বিল দেওয়া হয়নি। এখন যন্ত্রগুলোর কী অবস্থা, সেটি তাঁদের জানা নেই।
কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের জন্য কেনা চিকিৎসা সরঞ্জাম অচল পড়ে থাকার বিষয়টি জানার পর গত বছরের শেষ দিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তদন্তের নির্দেশ দেয়। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রংপুর বিভাগীয় পরিচালকের কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. ওয়াজেদ আলী বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পাওনা না পেয়ে যন্ত্রগুলো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দেয়নি, সেটি তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কুড়িগ্রাম জেলার ২০ লাখের বেশি মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসা এই জেনারেল হাসপাতাল। প্রতিদিন এক হাজারের বেশি মানুষ এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। হাসপাতালে পড়ে থাকা চিকিৎসা সরঞ্জামগুলো ব্যবহার করা গেলে গরিব মানুষ অল্প খরচে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সুযোগ পেতেন।
এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) কুড়িগ্রাম জেলা কমিটির সভাপতি মো. খাইরুল আনম বলেন, সরকারি অর্থে কেনা আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম বছরের পর বছর অচল পড়ে থাকা শুধু রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় নয়, এটি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির অধিকারকেও প্রশ্নের মুখে ফেলছে।