জয়পুরহাটে জনবল সংকটে স্বাস্থ্য সেবা,বঞ্চিত হতদরিদ্র রোগীরা । জেলায় ১০০ শয্যার জনবল নিয়ে চলছে ৪০০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালের স্বাস্থ্য সেবা কার্যক্রম। এতে একদিকে যেমন রোগীরা কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, তেমনে অন্যদিকে কম জনবল নিয়ে সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও নার্সরা।এছাড়াও চাহিদার তুলনায় সংকট রয়েছে ওষুধের । কাঙ্ক্ষিত সেবা না পেয়ে বাধ্য হয়ে রোগীরা যাচ্ছেন বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকে। এতে করে একদিকে বাড়ছে জনর্দূভোগ,অন্যদিকে বাড়ছে খরচ।আর সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছেন হতদরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছেন, ১৯৯৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়া ১০০ শয্যা বিশিষ্ট জয়পুরহাট আধুনিক জেলা হাসপাতালের উদ্বোধন করেন। ২০২৩ সালে যা ২৫০ শয্যায় উন্নীত হয়। সবশেষ জুলাই ২০২৬ হাসপাতালটি ২৫০ শয্যা থেকে ৪০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। তবে অনুমোদন ৪০০ শয্যার পেলেও চিকিৎসাসেবা চলছে ১০০ শয্যার জনবল দিয়েই ।
হাসপাতাল সূত্র বলছেন,জয়পুরহাটে ৪০০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালটিতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৭০০-৮০০ রোগী ভর্তি থাকে। আর আউটডোরে চিকিৎসা সেবা নেন প্রায় ১ হাজার
থেকে দেড় হাজার জন ।আর বর্তমানে শুধু ৪০০ শয্যা বেডে ভর্তি থাকা রোগীর জন্য খাবার সরবরাহ হচ্ছে।
ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ৪০০ শয্যার হাসপাতালের জন্য চাহিদা দিয়েছেন ৩০৫ জন চিকিৎসকের। বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৪৪ জন । এছাড়া নার্সের চাহিদা দেওয়া হয়েছে ২২৪ জনের। কর্মরত আছেন ১২৪ জন।
সূত্র আরও বলছেন, প্রায় ৪ বছর আগে আইসিইউ ইউনিট স্থাপন করা হলেও চিকিৎসক সংকটে সেটি যেমন এখনো দৃশ্যমান হয়নি, তেমনি নেই সিটি স্ক্যান ও এমআরআইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি। সংকট রয়েছে ওষুধেরও। ফলে এসব বহুমাত্রিক সংকটে কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন না রোগীরা।
অভিযোগ আছে, অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও দেখা মেলেনা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের। বাধ্য হয়ে রোগীদের স্থানীয় ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিতে হচ্ছে চিকিৎসা। গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত টাকা। এছাড়াও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে অনেক জটিল রোগীদের পাঠানো হচ্ছে অন্য জেলার মেডিকেলে। এতে করে রোগীদের দুর্ভোগ যেন চরমে,বাড়ছে যেমন খরচ , তেমনই পড়ছেন চরম বিপাকে। দ্রুত এসব সমস্যা সমাধানের দাবি জানিয়েছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা।
জেলার পাঁচবিবি উপজেলার শিরট্টি গ্রামের কোরবান আলী জানান, ‘এই হাসপাতালটি নামেই ৪০০ শয্যা, কিন্তু কাজে কিছুই নয়। এত দূর থেকে চিকিৎসা নিতে এসে ডাক্তার শুধু হাতে প্রেসক্রিপশন ধরিয়ে দিচ্ছেন। ওষুধপত্র সব বাহির থেকে কিনতে হচ্ছে। আমরা গরীব মানুষ, টাকা দিয়েই যদি সব কিছু কিনে আনতে হয় তাহলে সরকারি হাসপাতালে আসার দরকার কি?
উপজেলার শালাইপুর এলাকার রনি, আল আমিন ও আব্দুর রহিম বলেন, ‘টাকা দিয়ে ডাক্তারের ব্যক্তিগত চেম্বারে গেলে ভাল সেবা পাওয়া যায়। কিন্তু হাসপাতালে আসলে সেবা পাওয়া যায় না। টিকিট কেটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। কখনো ডাক্তার পাওয়া যায়, কখনো যায় না। সরকারের উচিত দ্রুত এই সব সমস্যার সমাধান করা।’
জেলার ক্ষেতলাল উপজেলার কুসুম শহর গ্রামের মহসিনা ও মোমেনা বেগম বলেন, ‘আমার দাদিকে হাসপাতালে ভর্তি করার দু’দিন পর্যন্ত কোন ওষুধ পাইনি। সব বাহিরে থেকে কিনতে হয়েছে। সরকারি হাসপাতালে আসলে ওষুধ পাবো, এজন্যই তো এখানে আসি।’
জেলার কালাই উপজেলার মাত্রায় বাজারের জামিল ও একরামুল হোসেন বলেন, ‘আমার স্ত্রীকে হাসপাতালে নিয়ে আসছি। কোন বেড পাইনি। এজন্য বারান্দায় শুয়ে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। একটা ওষুধও পাইনি,সব কিনতে হয়েছে বাহির থেকে,এমনকি স্যালাইন পর্যন্ত পাইনি।’
ধারকী গ্রামের আজাহার আল বলেন, রোগীর তুলনায় ‘ডাক্তার আনেক কম। এজন্য সবাই চিকিৎসা পাচ্ছে না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে।এত তীব্র গরমের মধ্যে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা অনেক কষ্টকর। টয়লেটের দরজার ছিটকিনি নেই, ময়লা থাকে। ডাক্তার নিয়োগ সহ এগুলো দ্রুত সংস্কার করা প্রয়োজন।’
জয়পুরহাট ৪০০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা: সরদার রাশেদ মোবারক জুয়েল বলেন, ‘১০০ শয্যার জনবল দিয়েই ৪০০ শয্যার হাসপাতাল চালাচ্ছি। তবে খাবার দেওয়া হচ্ছে ৪শ বেডের জন্যই। সিটিস্ক্যান ও এমআরইসহ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির চাহিদা দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘আইসিইউ ইউনিট নির্মাণের পর নার্সদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। ডাক্তারের অভাবে আইসিইউ চালু করা সম্ভব হয়নি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে সকল সংকটের বিষয়ে চাহিদা দেওয়া হয়েছে। আশা করি খুব দ্রুত এ সমস্যা সমাধান হবে।
প্রকাশক : সোহেল রানা সম্পাদক: আব্দুস সামাদ সায়েম
©২০১৫-২০২৫ সর্বস্ত্ব সংরক্ষিত । তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় কর্তৃক নিবন্ধনকৃত (নিবন্ধন নং-২১০)