এক দিকে প্রশান্ত মহাসাগর, অন্য দিকে ভারত মহাসাগর। তার মাঝে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের মাধ্যমে সৃষ্ট দ্বীপরাষ্ট্রের নাম ইন্দোনেশিয়া। প্রশান্ত মহাসাগরীয় আগ্নেয় বলয়ের মধ্যেই তার উপস্থিতি। ফলে দ্বীপগুলি যে অগ্ন্যুৎপাতপ্রবণ হবে, তা সহজেই অনুমেয়।
কিন্তু ইন্দোনেশিয়া সম্পর্কে বলতে গিয়ে সেখানেই থেমে গেলে চলবে না। কারণ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দ্বীপরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী অগ্ন্যুৎপাতগুলির সাক্ষী হয়েছে। এক বার নয়, বার বার। সম্প্রতি অগ্ন্যুৎপাতের কারণেই ফের শিরোনামে উঠে এসেছে ইন্দোনেশিয়া। সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে সক্রিয় হয়ে উঠেছিল জাভা এবং সুমাত্রার মাঝে অবস্থিত মাউন্ট আনাক ক্রাকাতাউ। ছোট হলেও এই আগ্নেয়গিরি মোটের উপর সক্রিয়। মাঝেমধ্যেই অগ্ন্যুৎপাত হয়। কিন্তু এ বারের অগ্ন্যুৎপাতের চরিত্র ছিল কিছুটা ভিন্ন।
টানা ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চলেছে ক্রাকাতাউয়ের বিস্ফোরক পর্যায়। দফায় দফায় অগ্ন্যুৎপাত হয়েছে। তার অভিঘাতে ছাইয়ের কুণ্ডলী উঠে গিয়েছিল ৫০ হাজার ফুট পর্যন্ত। দেশের আটটি বিমানবন্দর তার জন্য বন্ধ করে দিতে হয়। তিন লক্ষেরও বেশি যাত্রী আটকে পড়েন বিভিন্ন প্রান্তে। অগ্ন্যুৎপাতের খবর করতে গিয়ে সমুদ্রে নিখোঁজ হন আট জন। ১০ দিন ধরে তল্লাশি চালিয়েও তাঁদের সন্ধান না মেলায় অভিযান বন্ধ করেছে ইন্দোনেশিয়া প্রশাসন।
ইন্দোনেশিয়া একাধিক টেকটোনিক পাতের সংযোগস্থলে অবস্থিত। বিশেষ করে প্রশান্ত মহাসাগরের নীচে ইন্দো-অস্ট্রেলীয় পাতের একটি অংশ সুন্দা পাতের নীচে ঢুকে যাওয়া বা ‘সাবডাকশন’-এর ফলে সেখানে বিপুল আগ্নেয়গিরি তৈরি হয়েছে। ভূ-বিজ্ঞানীদের দাবি, ইন্দোনেশিয়ার দ্বীপগুলির অনেকগুলিই আসলে সমুদ্র থেকে উত্থিত এক একটি আগ্নেয়গিরিরই চূড়া। এই দ্বীপরাষ্ট্রে মোট আগ্নেয়গিরির সংখ্যা প্রায় ৫০০। ইন্দোনেশিয়ার সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সেখানে ১২৭টি সক্রিয় আগ্নেয়গিরি রয়েছে। তার মধ্যে ৬৯টি আগ্নেয়গিরির উপর সর্বক্ষণ নজরদারি চলে। ইন্দোনেশিয়াতেই বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সক্রিয় আগ্নেয়গিরি রয়েছে বলে সরকারি পরিসংখ্যান জানাচ্ছে।
তা ছাড়া, ইন্দোনেশিয়ায় যে প্রক্রিয়ায় আগ্নেয়গিরির সৃষ্টি, সেই প্রক্রিয়াতেই সৃষ্টি হয় ভূমিকম্প এবং সুনামিও! ইন্দোনেশিয়ার আগ্নেয়গিরিগুলি বিধ্বংসীও বটে। জাভা দ্বীপের কেন্দ্রে মাউন্ট মেরাপি ইতিহাসের সবচেয়ে বিধ্বংসী এবং প্রাণঘাতী বিপর্যয়গুলির সাক্ষী। একটি হিসাব বলছে, গত ১০০ বছরে এই আগ্নেয়গিরি অন্তত ২০০০ মানুষের প্রাণ কেড়েছে। ২০১০ সালের ভয়াবহ অগ্ন্যুৎপাতেই মৃত্যু হয়েছিল প্রায় ৪০০ জনের। কিন্তু কেন ইন্দোনেশিয়ায় আগ্নেয়গিরিগুলি এমন বিধ্বংসী? বিজ্ঞানীরা তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই কৌতূহলী। বিভিন্ন জায়গায় এ বিষয়ে একাধিক গবেষণা হয়েছে। কোনও ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা একমত হয়েছেন, কোনও ক্ষেত্রে নয়।
ভূ-বিজ্ঞানীদের দাবি, আগ্নেয়গিরি থেকে উৎপন্ন ম্যাগমার ধরন সর্বত্র একরকম হয় না। ম্যাগমার উৎপত্তিস্থলের উপর তা নির্ভর করে। সুইডেনের উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-বিশারদদের একটি দল এ বিষয়ে গবেষণা করতে গিয়ে প্রাথমিক ভাবে ম্যাগমার নমুনা বিশ্লেষণ করে দেখেছে। ভূপৃষ্ঠের অনেক গভীরে এই ম্যাগমা তৈরি হয়। ভূবিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীর গভীর থেকে উঠে আসার সময় ম্যাগমা ভূত্বকের বিভিন্ন শিলার সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে তার রাসায়নিক ও আইসোটোপিক বৈশিষ্ট্য বদলাতে পারে। উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা জাভার মেরাপি ও কেলুট এবং বালির বাটুর ও আগুং আগ্নেয়গিরির লাভা থেকে পাওয়া ক্লিনোপাইরক্সিন স্ফটিকের অক্সিজেন আইসোটোপ বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, বালির আগ্নেয়গিরিগুলির তুলনায় জাভার আগ্নেয়গিরিগুলির ম্যাগমায় ভূত্বকের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার ছাপ বেশি।
গবেষকদের ব্যাখ্যা, জাভার তুলনামূলক পুরু ভূত্বকের মধ্যে থাকা কার্বনেট-সমৃদ্ধ শিলার সঙ্গে ম্যাগমার মিথস্ক্রিয়ায় অতিরিক্ত কার্বন ডাই অক্সাইড-সহ উদ্বায়ী পদার্থ যুক্ত হতে পারে, যা অগ্ন্যুৎপাতের বিস্ফোরক চরিত্র বৃদ্ধি করতে ভূমিকা নিতে পারে। উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার ফলটি প্রকাশিত হয় নেচার কমিউনিকেশন্স পত্রিকায়। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, বালি এবং জাভা দ্বীপের ম্যাগমায় ভিন্ন ধরনের বিন্যাস রয়েছে। বালির ম্যাগমায় পাইরক্সিনের গঠনে তেমন কোনও পরিবর্তন নেই। ভূত্বকের মধ্যে দিয়ে যাত্রার পরেও তার ভিতরের অক্সিজেনের গঠন প্রায় অপরিবর্তিত। কিন্তু তুলনায় জাভার ম্যাগমায় মিথস্ক্রিয়ার চিহ্ন অনেক বেশি। এমনকি, মিথস্ক্রিয়ার কারণে সেখানকার ম্যাগমা আরও বিস্ফোরক ও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, দেখেছেন বিজ্ঞানীরা। জাভার ক্ষেত্রে ম্যাগমার নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল বিধ্বংসী সেই মাউন্ট মেরাপি থেকে। এ প্রসঙ্গে উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক তথা অধ্যাপক ভ্যালেন্টিন ট্রল বলেন, ‘‘জাভার মাউন্ট মেরাপির আইসোটোপিক বৈশিষ্ট্য বালির আগ্নেয়গিরিগুলির চেয়ে অনেকটাই আলাদা। কারণ, অগ্ন্যুৎপাতের আগে মেরাপির ম্যাগমা ভূত্বকের সঙ্গে ব্যাপক মিথস্ক্রিয়া করে।’’
ম্যাগমার মিথস্ক্রিয়ায় কেন আগ্নেয়গিরি বিস্ফোরক হচ্ছে? বিজ্ঞানীদের দাবি, এই মিথস্ক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মধ্য জাভার ভূত্বকে থাকা কার্বোনেট সমৃদ্ধ শিলার সঙ্গে ম্যাগমার মিথস্ক্রিয়ায় অতিরিক্ত কার্বন ডাই অক্সাইড মুক্ত হতে পারে। সেই গ্যাসের উপস্থিতি অগ্ন্যুৎপাতকে আরও বিস্ফোরক করে তোলার ক্ষেত্রে ভূমিকা নিতে পারে। সেই কারণেই মেরাপি-সহ জাভার আগ্নেয়গিরিগুলি আরও বেশি বিপজ্জনক। ইন্দোনেশিয়া জনবহুল দেশ। আগ্নেয়গিরির উপর নজরদারির পৃথক ব্যবস্থা সেখানে রেখেছে সরকার। তার পরেও বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন।
সূত্র: আনন্দবাজার
প্রকাশক : সোহেল রানা সম্পাদক: আব্দুস সামাদ সায়েম
©২০১৫-২০২৫ সর্বস্ত্ব সংরক্ষিত । তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় কর্তৃক নিবন্ধনকৃত (নিবন্ধন নং-২১০)