মিয়ানমারে চলমান সংঘাত ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যেই দেশটির নাগরিকদের ফেরত পাঠানোর কার্যক্রম শুরু করেছে মালয়েশিয়া। মঙ্গলবার প্রায় এক হাজার ৫০০ মিয়ানমারের নাগরিককে দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়। মালয়েশিয়া বলছে, এটি স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবাসন কর্মসূচির অংশ।
তবে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন সতর্ক করেছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে মিয়ানমারে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ নেই।
মালয়েশিয়ার পারাক রাজ্যের লুমুট নৌঘাঁটির কাছে মঙ্গলবার সকালে পুলিশি পাহারায় কয়েক ডজন বাস একটি স্টেডিয়ামে পৌঁছায়। সেখানে প্রত্যাবাসনপ্রত্যাশীদের প্রক্রিয়াজাত করার পর নৌঘাঁটিতে নিয়ে যাওয়া এবং জাহাজে করে মিয়ানমারে পাঠানোর কথা।
সাংবাদিকদের স্টেডিয়াম এলাকায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। প্রত্যাবাসনের জন্য দুটি মিয়ানমারের নৌবাহিনীর জাহাজ ও একটি হাসপাতাল জাহাজ ব্যবহারের কথা জানিয়েছে মালয়েশিয়া।
মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রথম ধাপে এক হাজার ৪৭৬ জন মিয়ানমারের নাগরিককে ফেরত পাঠানোর কথা রয়েছে। তাদেরকে মিয়ানমার সরকারের মাধ্যমে শনাক্ত করা হয়েছে। পুরো কর্মসূচির আওতায় পর্যায়ক্রমে প্রায় পাঁচ হাজার মিয়ানমারের নাগরিককে দেশে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে মঙ্গলবারের দলে কতজন রোহিঙ্গা ছিলেন, তা স্পষ্ট নয়। মালয়েশীয় কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে নির্দিষ্ট সংখ্যা প্রকাশ করেনি।
জাতিসংঘের তথ্যানুযায়ী, মালয়েশিয়ায় থাকা মিয়ানমারের প্রায় এক লাখ ৯৩ হাজার শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ রোহিঙ্গা।
নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিয়ে জাতিসংঘের আপত্তি
রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিয়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ জানিয়েছে ইউএনএইচসিআর। সংস্থাটি বলেছে, মিয়ানমারে চলমান সংঘাত ও সহিংসতার কারণে বর্তমানে শরণার্থীদের নিরাপদ, টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণভাবে ফেরার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। প্রত্যাবাসন কার্যক্রমে ইউএনএইচসিআরের কোনও ভূমিকা নেই বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি।
ইউএনএইচসিআরের বক্তব্য অনুযায়ী, কোনও শরণার্থীকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তটি অবশ্যই স্বেচ্ছায়, পর্যাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এবং নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করে হতে হবে।
মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবশ্য ইউএনএইচসিআরের সতর্কতা নিয়ে সরাসরি মন্তব্য করেনি। তারা আগের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে জানিয়েছে, প্রত্যাবাসন কর্মসূচিটি স্বেচ্ছামূলক।
মিয়ানমারে এখনও গৃহযুদ্ধ
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকেই মিয়ানমারজুড়ে ব্যাপক সংঘাত চলছে। দেশটির সামরিক বাহিনী বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে একাধিক ফ্রন্টে লড়াই করছে। রাখাইন রাজ্যেও মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ চলছে। এই অঞ্চলেই দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন চালানোর অভিযোগ রয়েছে।
২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ব্যাপক দমন-পীড়নের পর লাখ লাখ রোহিঙ্গা দেশ ছেড়ে বাংলাদেশসহ প্রতিবেশী দেশগুলোতে আশ্রয় নেয়। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ওই অভিযানের ঘটনাকে গণহত্যা হিসেবে বর্ণনা করেছে।
মিয়ানমার সরকার এখনও রোহিঙ্গাদের স্বতন্ত্র জাতিগোষ্ঠী হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয় না। দেশটির কর্তৃপক্ষ তাদের প্রায়ই ‘বাঙালি’ হিসেবে উল্লেখ করে থাকে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তীব্র আপত্তি
রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা নিয়ে মালয়েশিয়ার সরকারের প্রতি আপত্তি জানিয়েছে ১৬০টির বেশি নাগরিক ও মানবাধিকার সংগঠন। তাদের আশঙ্কা, মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হলে রোহিঙ্গারা চলমান সহিংসতার পাশাপাশি জোরপূর্বক সামরিক বাহিনীতে নিয়োগ, আটক বা অন্যান্য গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
ফর্টিফাই রাইটস নামে একটি মানবাধিকার সংগঠন এর আগে মালয়েশিয়াকে প্রায় এক হাজার ৫০০ মিয়ানমারের নাগরিককে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছিল। তাদের মতে, ফেরত পাঠানো ব্যক্তিরা নির্যাতন, নিপীড়ন, সশস্ত্র সংঘাত ও জোরপূর্বক নিয়োগের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্সও (এমএসএফ) প্রত্যাবাসন স্থগিত করে কাদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে এবং তাদের প্রত্যেকের সম্ভাব্য ঝুঁকি কী, তা প্রকাশ করার আহ্বান জানিয়েছে।
রোহিঙ্গা প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও একই ধরনের উদ্বেগ জানানো হয়েছে। তাদের বক্তব্য, যে পরিস্থিতির কারণে রোহিঙ্গারা মিয়ানমার ছেড়ে পালিয়েছিলেন, সেই পরিস্থিতির মৌলিক পরিবর্তন না হলে শুধু মানুষকে দেশে ফিরিয়ে পাঠানো সংকটের সমাধান নয়।
মালয়েশিয়ায় রোহিঙ্গাদের ওপর চাপ বাড়ছে
সাম্প্রতিক সময়ে মালয়েশিয়ায় রোহিঙ্গা ও অন্যান্য শরণার্থীদের ওপরও চাপ বেড়েছে। দেশটিতে শরণার্থীদের প্রতি স্থানীয় পর্যায়ে বিরূপ মনোভাব এবং অভিবাসনবিরোধী তৎপরতা জোরদার হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। চলতি বছরের জুলাইয়ে কুয়ালালামপুরে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার কার্যালয়ের বাইরে জড়ো হওয়া শতাধিক ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছিল। পরে তাদের কাছে ইউএনএইচসিআরের নথি থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর ছেড়ে দেওয়া হয়।
মালয়েশিয়া ১৯৫১ সালের জাতিসংঘের শরণার্থী কনভেনশনের সদস্য নয়। দেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে শরণার্থী মর্যাদাও স্বীকৃতি দেয় না। ফলে দেশটিতে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীদের অনেক ক্ষেত্রে অভিবাসন আইনের আওতায় অনিবন্ধিত অভিবাসী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
পাঁচ হাজার রোহিঙ্গা ফেরানোর পরিকল্পনা
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম জুলাইয়ে জানিয়েছিলেন, মিয়ানমার প্রায় পাঁচ হাজার রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে। পরে তিনি মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর প্রধান ও দেশটির বর্তমান নেতা মিন অং হ্লাইংকে মালয়েশিয়া সফরের আমন্ত্রণ জানানোর পরিকল্পনার কথাও জানান। প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে দুই দেশের মধ্যে আলোচনার উদ্যোগ হিসেবে বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়েছে।
মিয়ানমার সরকারও জানিয়েছে, যাচাই করা বাস্তুচ্যুত নাগরিকদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে দেশে ফেরাতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কাজ করছে। তবে রোহিঙ্গা অধিকারকর্মীদের বক্তব্য, কাগজে-কলমে ‘স্বেচ্ছামূলক’ প্রত্যাবাসন বলা হলেও আটক অবস্থায় থাকা কোনও ব্যক্তি সত্যিকার অর্থে স্বাধীনভাবে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বাংলাদেশেও ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা
মিয়ানমারের নিপীড়ন থেকে পালিয়ে সবচেয়ে বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছেন বাংলাদেশে। বর্তমানে বাংলাদেশে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী অবস্থান করছেন। মালয়েশিয়ায়ও ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এক লাখ ২৬ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী থাকার তথ্য পাওয়া যায়।
ফলে মালয়েশিয়া থেকে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ শরণার্থী নীতির বিষয় নয়; এটি দীর্ঘদিনের রোহিঙ্গা সংকটের ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
এখন মূল প্রশ্ন হলো- মিয়ানমারে চলমান যুদ্ধ, রাখাইনে সংঘাত এবং রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ও নিরাপত্তার মৌলিক সমস্যাগুলোর সমাধান না করে ফেরত পাঠানো ব্যক্তিরা দেশে গিয়ে কী ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হবেন। জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সতর্কতার বিপরীতে মালয়েশিয়া তাদের প্রত্যাবাসন কর্মসূচিকে স্বেচ্ছামূলক ও নিরাপদ বলে বর্ণনা করছে। সূত্র: আল-জাজিরা
প্রকাশক : সোহেল রানা সম্পাদক: আব্দুস সামাদ সায়েম
©২০১৫-২০২৫ সর্বস্ত্ব সংরক্ষিত । তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় কর্তৃক নিবন্ধনকৃত (নিবন্ধন নং-২১০)