প্রতিদিন গড়ে দেড় থেকে দুই হাজার রোগীর ভিড়। হাসপাতালে ভর্তি থাকেন প্রায় ৪৫০ জন। অথচ ৭২টি চিকিৎসক পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র ২২ জন। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিভাগে নেই কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। চিকিৎসকের পাশাপাশি নার্স ও কারিগরি জনবলের সংকটও প্রকট। ফলে বিপুল রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। দীর্ঘ অপেক্ষা, অতিরিক্ত রোগীর চাপ এবং প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা না পাওয়ায় ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ রোগীরা।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, কাগজে-কলমে শরীয়তপুর সদর হাসপাতাল ২৫০ শয্যায় উন্নীত হলেও এখনো ১০০ শয্যার জনবল কাঠামো অনুযায়ী কার্যক্রম চলছে। অনুমোদিত ৭২টি চিকিৎসক পদের মধ্যে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ২২ জন। এর মধ্যে অনেক চিকিৎসক পদোন্নতি ও প্রেষণে অন্যত্র দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে বাস্তবে রোগীসেবায় নিয়োজিত চিকিৎসকের সংখ্যা আরও কম।
হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ বিভাগগুলোর অবস্থাও নাজুক। শিশু, নাক-কান-গলা, চক্ষু প্যথলজি বিভাগ ও হৃদরোগ বিভাগে নেই কোনো কনসালট্যান্ট ডাক্তার। ১১টি সিনিয়র কনসালট্যান্ট পদের বিপরীতে দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র একজন। ফলে এসব বিভাগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার প্রয়োজন হলে রোগীদের অনেক সময় শরীয়তপুরের বাইরে যেতে হচ্ছে।
চিকিৎসকের পাশাপাশি নার্স সংকটও রয়েছে। ৯২টি অনুমোদিত নার্স পদের বিপরীতে কর্মরত ৫৯ জন। তাদের মধ্যে কেউ প্রেষণে, কেউ মাতৃত্বকালীন ছুটিতে এবং কেউ অবসর-পরবর্তী ছুটিতে থাকায় বাস্তবে কর্মরত নার্সের সংখ্যাও কম। একই সঙ্গে কারিগরি জনবলের ঘাটতিও রয়েছে।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের অভিযোগ, বহির্বিভাগে চিকিৎসকের কক্ষের সামনে প্রতিদিন দীর্ঘ সারি থাকে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেকে কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা পান না।
হাসপাতালে সরেজমিনে দেখা গেছে, বিভিন্ন ওয়ার্ড ও করিডরে রোগী ও স্বজনদের ভিড়। কোথাও শয্যা না পেয়ে মেঝেতে বিছানা পেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন রোগীরা। শিশু ও নারী রোগীদেরও এমন অবস্থায় থাকতে হচ্ছে। নির্ধারিত শয্যার তুলনায় রোগী বেশি হওয়ায় চিকিৎসকদের ওপরও বাড়ছে অতিরিক্ত চাপ। হাসপাতালে নির্ধারিত শয্যার তুলনায় প্রতিদিন চার-পাঁচ গুণ বেশি রোগী ভর্তি থাকেন। ফলে বারান্দা, করিডর ও বিভিন্ন ফাঁকা জায়গায় রোগীদের চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। অনেক সময় টয়লেটের পাশেও রোগী ও স্বজনদের অবস্থান করতে দেখা যায়।
সুলতানা বেগম ও সুমাইয়া আক্তার নামে দুজন রোগী বলেন, ‘চিকিৎসা নিতে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এত রোগীর থাকার পর ও চিকিৎসক সংখ্যা অনেক কম থাকায় আমাদের দীর্ঘসময় দাড়িয়ে থেকে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। শুনছি, এই হাসপাতালে ডাক্তার অনেক ঘাটতি আছে। দ্রুত পর্যাপ্ত চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া দরকার।’
হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের জুনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. মো. ইকবাল হোসেন ও মেডিকেল অফিসার ডা. জাহিদুল ইসলাম বলেন, জনবল সংকটের কারণে চিকিৎসকদের ওপর অতিরিক্ত শারীরিক ও মানসিক চাপ তৈরি হচ্ছে। যেখানে চার-পাঁচজন চিকিৎসকের দায়িত্ব পালনের কথা, সেখানে অনেক সময় একজনকেই একাধিক দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে। এতে রোগীদের মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. মিতু বলেন, ‘রোগীর যে চাপ, সেই তুলনায় পর্যাপ্ত চিকিৎসক না থাকায় সেবা দিতে গিয়ে চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।’
জনবল সংকটের বিষয়টি স্বীকার করে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোহাম্মাদ আকরাম এলাহী বলেন, ‘প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও জনবল চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। তবে এখনো সংকটের সমাধান হয়নি। প্রয়োজনীয় জনবল পদায়নের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
প্রকাশক : সোহেল রানা সম্পাদক: আব্দুস সামাদ সায়েম
©২০১৫-২০২৫ সর্বস্ত্ব সংরক্ষিত । তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় কর্তৃক নিবন্ধনকৃত (নিবন্ধন নং-২১০)