সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় উৎসবমুখর পরিবেশ, ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও নানা আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। বিজয়া দশমীর দিনে উপজেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপ থেকে শোভাযাত্রা নিয়ে ভক্তরা ঘাটিনা সেতুসংলগ্ন করতোয়া নদীর তীরে সমবেত হন। পরে ধর্মীয় রীতিনীতি অনুসরণ করে দেবী দুর্গার প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় পাঁচ দিনব্যাপী এই উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা।
বুধবার (২১ অক্টোবর) সকাল থেকেই উল্লাপাড়া উপজেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপে শুরু হয় বিজয়া দশমীর পূজা-অর্চনা ও বিদায়পর্বের আনুষ্ঠানিকতা। এ সময় ভক্তদের মধ্যে ছিল বিদায়ের বেদনা, আবার আগামী বছর দেবীর আগমনের প্রত্যাশা। ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি ও ভক্তদের জয়ধ্বনিতে উৎসবমুখর হয়ে ওঠে পূজামণ্ডপ ও আশপাশের এলাকা।
সকাল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন পূজামণ্ডপ থেকে প্রতিমা নিয়ে শোভাযাত্রা বের হয়।
শোভাযাত্রাগুলো ঘাটিনা সেতুসংলগ্ন করতোয়া নদীর তীরে পৌঁছালে সেখানে ভক্তদের সমাগম বাড়তে থাকে। নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষ দেবী দুর্গাকে শেষবারের মতো দর্শন করতে নদীর তীরে উপস্থিত হন। অনেক ভক্ত দেবীর চরণে প্রণাম করে পরিবার-পরিজন, সমাজ ও দেশের শান্তি, সমৃদ্ধি এবং কল্যাণ কামনা করেন।
বিসর্জনের আগে পূজামণ্ডপগুলোতে চলে দেবীর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন ও বিদায় জানানোর আনুষ্ঠানিকতা। ভক্তদের বিশ্বাস, দেবী দুর্গা অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শুভ শক্তির প্রতিষ্ঠার প্রতীক। তাই দেবীকে বিদায় জানানোর মধ্যেও তাঁদের মনে থাকে অন্যায়-অশান্তি দূর হয়ে পৃথিবীতে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা।
করতোয়ার তীরে বিসর্জনের আনুষ্ঠানিকতা
উল্লাপাড়ার ঘাটিনা সেতুসংলগ্ন করতোয়া নদীর তীর প্রতিমা বিসর্জনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে উৎসবের শেষ দিনে প্রাণচাঞ্চল্যে ভরে ওঠে। নদীর তীরে প্রতিমা নিয়ে আসার পর ধর্মীয় রীতি অনুসরণ করে বিসর্জনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। একে একে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় শারদীয় দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা।
প্রতিমা বিসর্জনের সময় অনেক ভক্তকে আবেগাপ্লুত হতে দেখা যায়। কয়েক দিনের আনন্দ, পূজা-অর্চনা ও মিলনমেলার পর দেবীকে বিদায় জানানোর মুহূর্তে তাঁদের চোখেমুখে ফুটে ওঠে বিষাদের ছাপ। তবে সেই বিষাদের মধ্যেও ছিল নতুন আশার আলো। আগামী বছর আবারও দেবী দুর্গা পৃথিবীতে আসবেন—এমন বিশ্বাস থেকেই ভক্তরা অপেক্ষায় থাকেন আরেকটি শারদীয় উৎসবের।
নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী
প্রতিমা বিসর্জনকে কেন্দ্র করে ঘাটিনা সেতুসংলগ্ন করতোয়া নদীর তীরে মানুষের সমাগম বাড়ায় নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। উৎসব নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি নদীর ঘাটে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদেরও প্রস্তুত রাখা হয় বলে জানানো হয়েছে।
নদীর তীরে ভিড় নিয়ন্ত্রণ, বিসর্জনের সময় শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং সম্ভাব্য দুর্ঘটনা এড়াতে সতর্কতা অবলম্বনের বিষয়টি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। সংশ্লিষ্টদের তৎপরতায় ধর্মীয় এই আয়োজন শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের বার্তা
শারদীয় দুর্গোৎসব শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি বাঙালির ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সামাজিক সম্প্রীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে তৈরি হয় মিলনমেলা। উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বন্ধন আরও দৃঢ় হয়।
উল্লাপাড়ায়ও দুর্গোৎসবের শেষ দিনে প্রতিমা বিসর্জনকে কেন্দ্র করে ভক্তদের মধ্যে ছিল আবেগ ও প্রত্যাশার মিশ্র অনুভূতি। দেবী দুর্গাকে বিদায় জানিয়ে তাঁরা প্রার্থনা করেন, পৃথিবী থেকে অশুভ শক্তির বিনাশ হোক, মানুষের জীবনে ফিরে আসুক শান্তি, সুখ ও সমৃদ্ধি। একই সঙ্গে সমাজে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ অটুট থাকুক।
প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হলো এ বছরের শারদীয় দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা। তবে ভক্তদের হৃদয়ে রয়ে গেল উৎসবের স্মৃতি, মিলনমেলার আনন্দ এবং আগামী বছর আবারও দেবী দুর্গার আগমনের প্রতীক্ষা। তাঁদের বিশ্বাস, মা দুর্গা আবারও আসবেন মর্ত্যে—অশুভ শক্তির বিনাশ, শুভ শক্তির প্রতিষ্ঠা এবং মানুষের জীবনে সুখ-শান্তির বার্তা নিয়ে।
প্রকাশক : সোহেল রানা সম্পাদক: আব্দুস সামাদ সায়েম
©২০১৫-২০২৫ সর্বস্ত্ব সংরক্ষিত । তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় কর্তৃক নিবন্ধনকৃত (নিবন্ধন নং-২১০)