জীবন-জীবিকার তাগিদে প্রতিদিনই ছুটে চলা। আবার কখনো পাড়া-মহল্লার অলিগলি, আবার কখনো ব্যস্ত সড়ক কিংবা মানুষের আনাগোনায় মুখরিত বাজার। কাঁধে বাদামের বোঝা নিয়ে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ঘুরে বেড়ানে। দিন শেষে বাদাম বিক্রি করে যা আয় হয়, তা দিয়েই চলে পরিবারের ভরণপোষণ। এভাবেই জীবনের দীর্ঘ ৪২টি বছর কাটিয়ে দিয়েছেন সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার এনায়েতপুর আশ্রয় প্রকল্পের বাসিন্দা জমিন ইসলাম।
বয়সের ভার আর জীবনের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়েও থেমে নেই তাঁর জীবনসংগ্রাম। প্রতিদিন উল্লাপাড়ার বিভিন্ন এলাকায় অলিগলি ঘুরে বাদাম বিক্রি করেন তিনি। এই ক্ষুদ্র ব্যবসাই তাঁর জীবনের একমাত্র অবলম্বন।
বাদাম বিক্রি করে যা আয় করেন, তা দিয়ে পরিবারের সদস্যদের মুখে খাবার তুলে দেওয়া, সংসারের খরচ চালানোসহ প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানোর চেষ্টা করেন। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে এভাবেই চলছে তাঁর জীবন।
জমিন ইসলামের পরিবারে দুই ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। স্ত্রীসহ চার সদস্যের এই পরিবারের দায়িত্ব তাঁর কাঁধেই। প্রতিদিনের আয় দিয়েই চলে সংসার। আয় বন্ধ থাকলে কিংবা বাদাম বিক্রি কম হলে সংসারের খরচ মেটানোও কঠিন হয়ে পড়ে। তারপরও জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন বেরিয়ে পড়েন বাদাম নিয়ে। রোদ-বৃষ্টি কিংবা শারীরিক ক্লান্তি উপেক্ষা করে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বাদাম বিক্রি করাই তাঁর নিত্যদিনের কাজ।
জমিন ইসলাম জানান, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ হাজার ৭০০ টাকার বাদাম বিক্রি করতে পারেন তিনি। বিক্রির এই অর্থ থেকে বাদামের ক্রয়মূল্য ও অন্যান্য খরচ বাদ দিয়ে তাঁর দৈনিক পারিশ্রমিক থাকে প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। এই সামান্য আয় দিয়েই তাঁকে পরিবারের দৈনন্দিন খরচ চালাতে হয়। আয় সীমিত হলেও সংসারের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই তাঁর।
দৈনিক যমুনার কথাকে জমিন ইসলাম বলেন, প্রতিদিন বাদাম বিক্রি করে যে টাকা পাই, তা দিয়েই আমার সংসার চালাতে হয়। এভাবেই প্রায় ৪২ বছর ধরে জীবন কাটাচ্ছি। প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ৭০০ টাকার বাদাম বিক্রি করতে পারি। সব খরচ বাদ দিয়ে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকার মতো থাকে। এই বাদাম বিক্রি করেই আমার একটি মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি।
তাঁর কথায় ফুটে ওঠে দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, দায়িত্ববোধ আর পরিবারের প্রতি ভালোবাসার চিত্র। সামান্য পুঁজি নিয়ে শুরু করা বাদাম বিক্রির এই পেশাই তাঁকে বছরের পর বছর টিকিয়ে রেখেছে। বড় কোনো ব্যবসা কিংবা স্থায়ী আয়ের ব্যবস্থা না থাকলেও নিজের শ্রমকে পুঁজি করেই সংসার চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
জীবনের দীর্ঘ সময় ধরে বাদাম বিক্রি করতে গিয়ে কত মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে, কত পথ পাড়ি দিতে হয়েছে—তার হিসাব হয়তো জমিন ইসলামের নিজের কাছেও নেই। তবে প্রতিদিনের পথচলার লক্ষ্য একটাই, বাদাম বিক্রি করে কিছু টাকা আয় করা এবং পরিবারের প্রয়োজন মেটানো। তাঁর কাছে প্রতিটি দিনই নতুন করে উপার্জনের লড়াই।
একটি মেয়েকে বিয়ে দিতে পেরেছেন বাদাম বিক্রির আয় থেকে—এটিকে জীবনের বড় অর্জন হিসেবে দেখেন তিনি। সীমিত আয়ের মধ্যেও পরিবারের দায়িত্ব পালন করে যাওয়াই তাঁর কাছে তৃপ্তির বিষয়। তবে দীর্ঘদিনের এই পরিশ্রমের বিনিময়ে জীবনে কতটুকু স্বস্তি এসেছে, সেই প্রশ্নও থেকে যায়। কারণ, প্রতিদিনের আয় দিয়েই যখন সংসার চালাতে হয়, তখন ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় কিংবা বাড়তি কোনো নিরাপত্তা গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ে।
জমিন ইসলামের জীবনসংগ্রাম কেবল একজন বাদাম বিক্রেতার গল্প নয়; এটি দেশের অসংখ্য ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষের প্রতিদিনের বাস্তবতারও প্রতিচ্ছবি। যাঁরা নিজেদের শ্রম আর ঘাম ঝরিয়ে পরিবারের মুখে খাবার তুলে দেন, তাঁদের জীবনে প্রতিটি দিনের উপার্জনই গুরুত্বপূর্ণ। দিন শেষে সামান্য লাভ নিয়ে ঘরে ফেরা এসব মানুষের নিরলস পরিশ্রমেই সচল থাকে গ্রামীণ অর্থনীতির ক্ষুদ্র পরিসর।
উল্লাপাড়ার পথে পথে বাদাম বিক্রি করে জীবনের ৪২ বছর পার করা জমিন ইসলাম আজও জীবিকার সন্ধানে ঘুরে বেড়ান। বয়স, ক্লান্তি কিংবা জীবনের প্রতিকূলতা তাঁকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। পরিবারের দায়িত্ব পালন আর বেঁচে থাকার তাগিদে প্রতিদিনের এই পথচলাই তাঁর জীবনসংগ্রামের গল্প।
প্রকাশক : সোহেল রানা সম্পাদক: আব্দুস সামাদ সায়েম
©২০১৫-২০২৫ সর্বস্ত্ব সংরক্ষিত । তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় কর্তৃক নিবন্ধনকৃত (নিবন্ধন নং-২১০)