মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টির বড় পরাজয়ের পর ট্রাম্প প্রশাসনের মন্ত্রিসভায় বড় ধরনের রদবদলের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে। মার্কিন গণমাধ্যমের খবরে দাবি করা হচ্ছে, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও নিজেদের পদ ছাড়তে পারেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কার্যালয় হোয়াইট হাউস এই খবরটি আনুষ্ঠানিকভাবে অস্বীকার করেছে এবং একে গুঞ্জন বলে উড়িয়ে দিয়েছে।
গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, বিশেষ করে ইরান যুদ্ধের ব্যবস্থাপনা এবং এর জের ধরে নির্বাচনে রিপাবলিকানদের ভরাডুবির কারণে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার জোরালো দাবি উঠেছে। বিদায়ী একজন রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য হুমকি দিয়েছেন যে, আগামী সপ্তাহেই তিনি হেগসেথের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রস্তাব আনতে পারেন।
তবে অভিশংসনের এই প্রচেষ্টাকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী নিজে। এক ভিডিও বার্তায় হেগসেথ নিজের কাজের মেয়াদের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে এই উদ্যোগের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, আপনারা দেখছেন, তারা আমাকে এবং আমাদের আক্রমণ করছে কারণ আমরা কার্যকর কাজ করছি। তবে এসব করে কোনো লাভ হবে না। আমরা একচুলও পিছিয়ে যাব না।
তিনি বিরোধীদের সমালোচনা করে আরও বলেন, তাদের কোনো নীতি কাজ করে না। তাই রাজনৈতিক নাটকের প্রতি তাদের এই অন্ধ মানসিকতা তারা প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। এটি পুরোপুরি ব্যক্তিস্বার্থের নোংরা রাজনীতি।
ভিডিও বার্তায় হেগসেথ দাবি করেন যে, তার মেয়াদে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ 'আমেরিকা ফার্স্ট' এজেন্ডা বাস্তবায়নে বহু অর্জন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে সেনাবাহিনীতে নতুন সদস্য নিয়োগ বৃদ্ধি করা, প্রতিরক্ষা শিল্পের ভিত্তি পুনর্গঠন করা এবং বৈচিত্র্য সংক্রান্ত কর্মসূচি (ডাইভারসিটি ইনিশিয়েটিভ) মূল উপড়ে ফেলা। তবে তিনি টেনেসি রাজ্যের ফাঁকা হতে যাওয়া সিনেট আসনে নির্বাচনের আগ্রহ দেখাচ্ছেন বলেও রাজনৈতিক অঙ্গনে গুঞ্জন রয়েছে।
রিপাবলিকান দলের এক সমালোচক প্রতিনিধি থমাস ম্যাসি গণমাধ্যম পলিটিকো-কে জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহের শুরুতেই তিনি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রস্তাব উত্থাপন করবেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ এক বার্তায় ম্যাসি সতর্ক করে বলেন, আগামী জানুয়ারিতে ডেমোক্রেট-নিয়ন্ত্রিত নতুন কংগ্রেস গঠিত হওয়ার আগেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উচিত হেগসেথকে সরিয়ে সিনেটের মাধ্যমে নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী নিশ্চিত করা।
অন্যদিকে, ২০২৮ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার উদ্দেশ্যে পদত্যাগ করতে পারেন এমন খবর নাকচ করে দিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। নিউইয়র্ক টাইমস-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রুবিও বলেন, প্রেসিডেন্টের পুরো মেয়াদে ট্রাম্পের সঙ্গেই কাজ করার পরিকল্পনা তার সবসময় ছিল। তিনি বলেন, আমি যে কাজটি করছি তা দারুণভাবে উপভোগ করছি। আর তারা যখন বলে আমি চাকরি ছেড়ে চলে যাচ্ছি, তখন আমার হাসি পায়। আমি নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করি, 'কোন কাজটা ছাড়ছি?
হোয়াইট হাউস এবং মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট উভয় সংস্থাই রুবিওর পদত্যাগের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি ভিত্তিহীন ও ভুয়া খবর বলে অভিহিত করেছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্বপদে বহাল থাকার ঘোষণা দিলেও প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বেশ অনিশ্চিত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং ভাইস-প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স উভয়েই রিপাবলিকান দলের পরাজয়ের জন্য ইরান যুদ্ধকে দায়ী করেছেন। এই পরাজয়ের ফলেই মার্কিন নিম্নকক্ষ হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস এবং উচ্চকক্ষ সিনেট; উভয় চেম্বারেই পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে রিপাবলিকানরা, যা চলে গেছে ডেমোক্রেটদের হাতে।
টেলিভিশন চ্যানেল এবিসি নিউজকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্বীকার করেন যে, হেগসেথকে পদ থেকে সরানোর ব্যাপারে তিনি বেশ কিছু ফোন কল পেয়েছেন। কিন্তু তিনি যোগ করেন, হেগসেথকে পদে রেখে দেওয়ার সম্পূর্ণ ইচ্ছা তার আছে।
পরবর্তীতে হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সামনে ট্রাম্প বলেন, পিট হেগসেথ চমৎকার কাজ করেছেন। এরপর তিনি হেগসেথের বিভিন্ন অর্জনের কথা তুলে ধরেন, যার মধ্যে গত জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোর গ্রেপ্তার এবং নয় মাস ধরে চলা ইরান যুদ্ধের নানা পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত।
দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জয়েন্ট চিফ অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন অথবা সেন্টকম (সেন্ট্রাল কমান্ড) প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারকে পদচ্যুত করার কথা বিবেচনা করতে পারেন। প্রায় আট মাস আগে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধে কৌশলগত পরামর্শ প্রদানের পেছনে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
রাজনৈতিক সমীকরণ ও মধ্যবর্তী নির্বাচনের এই বিশাল বিপর্যয়ের পর ট্রাম্প প্রশাসনের ক্ষমতার ওপর বড় ধাক্কা আসলেও পরিস্থিতি সামাল দিতে সচেষ্ট হোয়াইট হাউস।
সূত্র: বিবিসি
প্রকাশক : সোহেল রানা সম্পাদক: আব্দুস সামাদ সায়েম
©২০১৫-২০২৫ সর্বস্ত্ব সংরক্ষিত । তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় কর্তৃক নিবন্ধনকৃত (নিবন্ধন নং-২১০)