সরকারবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে ইরান। দেশটিতে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভ দমনাভিযানে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে অন্তত ৬৫০ জনে। অর্থনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিক্ষোভ হঠাৎ করেই সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। তবে ইরান সরকারের অভিযোগ, বিক্ষোভকারীদের উসকানি ও মদত দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের বদলে নির্বিচারে সরকারি স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে বিক্ষোভকারীরা। এছাড়াও তারা দেশটির অন্তত অর্ধশতাধিক মসজিদে আগুন দিয়েছে। ধ্বংস করেছে ১৮০ অ্যাম্বুলেন্স। সোমবার তেহরানে বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, বিক্ষোভ শুরুর পর থেকে মোট ৫৩টি মসজিদ ও ১৮০টি অ্যাম্বুলেন্সে আগুন দেওয়া হয়েছে। তার মতে, কোন ইরানি কখনও মসজিদে হামলা চালাতে পারে না।
গত সপ্তাহে তেহরানের আবুজার মসজিদের ভেতরের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, মুখে মাস্ক পরা প্রায় এক ডজন ব্যক্তি মসজিদটি তছনছ করছে, বইপত্র মেঝেতে ছুড়ে ফেলছে এবং আসবাবপত্র ভাঙচুর করছে। ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা রয়টার্স ভিডিওটির সত্যতা যাচাই করেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, গত ৯ জানুয়ারি মসজিদটিতে আগুন দেওয়া হয়।
এদিকে সোমবার সরকারের সমর্থনে রাস্তায় নেমেছেন লাখ লাখ ইরানি। দেশটির প্রধান শহরগুলোতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে তারা যেমন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন, তেমনি ‘মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের’ বিরুদ্ধেও স্লোগান দিয়েছেন তারা।
ইরানের বিক্ষোভ শুরুর পর থেকেই দেশটির সরকারকে উদ্দেশ্য করে একের পর এক ‘উসকানিমূলক’ বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানে ‘বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা হলে’ তিনি সেখানে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকিও দিয়েছেন। জবাবে ইরানও সাফ জানিয়ে দিয়েছে, সার্বভৌমত্বে আঘাত এলে তারা মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানাবে। তবে এই বাগযুদ্ধের মধ্যেও দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই। সোমবার এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি বলেছেন, 'আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূতের (স্টিভ উইটকফ) মধ্যে যোগাযোগের চ্যানেল খোলা রয়েছে। প্রয়োজন হলে বার্তা আদান-প্রদানও করা হচ্ছে।'
এদিকে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, পরিস্থিতি এখন ‘পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে’। একই সঙ্গে তিনি জানান, ইরান যুদ্ধ চায় না। তবে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশটি প্রস্তুত। সংলাপের পথও খোলা রাখা হয়েছে বলে জানান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাগেরি। তবে বিদেশি হস্তক্ষেপ মেনে নেওয়া হবে না বলে স্পষ্ট করেছে তেহরান। অন্যদিকে ট্রাম্প বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়নের ঘটনায় কড়া ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ইরান ‘শেষ সীমা অতিক্রম করতে শুরু করেছে’। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী বিষয়টি নজরে রাখছে বলেও জানান তিনি। ট্রাম্প বলেন, প্রয়োজনে কিছু কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, সংকট সমাধানে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছে তেহরান।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে একাধিক বিকল্প প্রস্তুত রেখেছে। এর মধ্যে রয়েছে সামরিক হামলা, সাইবার আক্রমণ (ডিজিটাল ব্যবস্থায় গোপন আঘাত), নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করা এবং সরকারবিরোধী পক্ষকে সহায়তা দেওয়া। বিশ্লেষকেরা বলছেন, যেকোনো সামরিক পদক্ষেপে ব্যাপক বেসামরিক প্রাণহানির ঝুঁকি রয়েছে। কারণ, ইরানের অনেক সামরিক স্থাপনা জনবহুল এলাকায় অবস্থিত। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পথে যাওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। সূত্র: রয়টার্স, বিবিসি
প্রকাশক : সোহেল রানা সম্পাদক: আব্দুস সামাদ সায়েম
©২০১৫-২০২৫ সর্বস্ত্ব সংরক্ষিত । তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় কর্তৃক নিবন্ধনকৃত (নিবন্ধন নং-২১০)