মাঘের কনকনে শীত আর কুয়াশার চাদরে ঢাকা রাত শেষ না হতেই রস সংগ্রহ করে খেজুর গুড় তৈরীতে ব্যস্ত হয়ে উঠেন গাছীরা। সবাই যখন গভীর ঘুমে মগ্ন, তখন থেকেই শুরু হয় রস সংগ্রহের মহামড়ি ব্যস্ততা।পূব আকাশে ভোরের আলো ফোটার আগেই জ্বলে উঠে রস জ্বাল করা উনুন।
এমনটাই ব্যস্ততার মাঝে শীতের আমেজেই যেন একটু বেশি রঙিন হয়েছে জয়পুরহাট জেলা সদরের খনজনপুর কুঠিবাড়ি এলাকা। খেজুর গুড়ের মন মাতানো ঘ্রাণে বিমহিত এলাকাবাসী,মৌ মৌ সুবাস ছড়িয়ে পড়ছে পুরো এলাকায়।
সরেজমিন দেখা যায়, বিশাল তিনটি উনুনে বড় বড় টিনের ডোঙ্গা কড়াই বসানো হয়েছে।কড়াইগুলোতে খেজুরের রস দিয়ে জ্বাল দেওয়া হচ্ছে বিরততিহীনভাবে । আর গাছিরা একাগ্রচিত্তে সেই রস হাতা দিয়ে নেড়েই চলেছেন যাতে করে নিচে পুড়ে না যায়। আগুনের তাপে সাদা রস ধীরে ধীরে সোনালী রং ধারণ করছে, আর সবশেষে রং ধারণ করছে গাঢ় খয়েরি । এরপর কয়েকটি আলাদা আলাদা গামলায় ঢেলে লাড়কি দিয়ে নাড়ানো হচ্ছে। একপর্যায় সেগুলো শক্ত হতে লাগলে কাঠের তৈরি ফর্মাতে ঢেলে দেওয়া হচ্ছে। এরপরেই তৈরি হচ্ছে সুস্বাদু দানাদার পাটালি গুড়।
গাছীরা জানান, শীতের আগ মুহুর্তে আশ্বিন মাসে এসে গাছের মালিকের থেকে চুক্তি করে খেজুর গাছ কিনে নেওয়া হয়। আর একটি গাছের জন্য মৌসুমে দিতে হয় তিন কেজি গুড়। এরপর খেজুরের রস সংগ্রহের জন্য কার্তিক মাসে ধারালো দা দিয়ে গাছের ওপরের অংশ চেছে পরিষ্কার করে দেওয়া হয়।আর অগ্রহায়ণ মাসের ঠিক মাঝামাঝি সময়ে খেজুরগাছ থেকে শুরু হয় রস সংগ্র। সেক্ষেত্রে মাটির হাঁড়ি বা প্লাস্টিকের কৌটা পেতে দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা করে প্রায় রাতভর জড়ো হয় এই রস। পাত্রে জড়ো হওয়া এই রস গাচ থেকে নামিয়ে জ্বাল দিয়ে তৈরী করা হয় খেজুরের ঝোলা গুড় ও পাটালি গুড়।
রাজশাহী জেলার বাঘা থানা থেকে জয়পুরহাটের কুঠিবাড়ী ব্রিজ এলাকায় এসেছেন গাছী আনছার আলী। তিনি বলেন, কার্তিক মাসে এসে বিভিন্ন এলাকায় খেজুর গাছে হাঁড়ি লাগিয়েছি,এবার ৩৫০টি খেজুর গাছ লাগানো হয়েছে। আমরা ৫জন গাছী মিলে প্রতিদিন প্রায় ২০০টি গাছের রস সংগ্রহ করি। এসব রস থেকে দৈনিক প্রায় ৮০-১০০ কেজি গুড় তৈরি হয়।
একই জায়গার আরেক গাছী সাজেদুল ইসলাম বলেন, আমরা আশ্বিন মাসে আসি।আমাদের থাকার জন্য এখানে অস্থায়ী ঘর ও রস জ্বাল দেওয়ার জন্য চুলা তৈরি করতে হয়। কার্তিক মাসে গাছ কাটি (উপরের অংশ চেঁছে পরিষ্কার করা)। এরপর শুরু হয় রস সংগ্রহের কাজ । প্রতিদিন দুপুরে গাছে হাঁড়ি লাগানো হয়। রাত ২টা-৩টার গিয়ে রস গাছ থেকে নামানো হয়। সব গাছের রস নামাতে নামাতে রাত প্রায় ভোর হয়ে যায়। এরপর সেই রস জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরি করি।
তিনি বলেন, আমরা গুড় বানাই, মানুষ এসে গুড় কিনে নেয়। আবার এখানে অনেক মানুষ খুব সকালে এসে রস খেয়ে যায়। কেউ কেউ রস বাড়ির জন্যও নিয়ে যায়।
নওগাঁ জেলার বদলগাছী উপজেলার ঐতিহাসিক বৌদ্ধবিহার পাহাড়পুর এলাকা থেকে কুঠিবাড়ি ব্রিজ এলাকায় খেজুরের রস খেতে এসেছিলেন মো: আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, কুঠিবাড়ি ব্রিজ এলাকায় নাকি খুব সুন্দর রস ও গুড় পাওয়া যায়। একথা শুনে খুব সকালে আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে এসেছি। ৫ লিটার রস কিনে আমরা খেয়েছি। তাছাড়া এখানে অনেক সুন্দরভাবে গুড় তৈরি করিচ্ছে। সেটা আমরা দেখলাম। আবার বাসার জন্য দুই কেজি গুড়ও কিনেছি।
জয়পুরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক এ.কে.এম সাদিকুল ইসলাম বলেন, চলতি রস সংগ্রহ মৌসুমে এ জেলায় রস সংগ্রহের উপযুক্ত ২৬ হাজার ১০৫টি খেজুর গাছ রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৮ হাজার গাছ থেকে আনুমানিক ৫০০ জন গাছি রস সংগ্রহ এবং গুড় তৈরি করছেন। এ মৌসুমে জেলায় ১৯০ টন পাটালি গুড় ও ৮২ টন ঝোলা গুড়সহ মোট ২৭২ টন গুড় উৎপাদন হবে বলে আশা করেন তিনি।
তিনি বলেন, নিপাহ ভাইরাস প্রতিরোধে বাদুড় বা এ জাতীয় প্রাণী যাতে রসের সংস্পর্শে না আসে, সেজন্য গাছীদের কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে নেট ব্যবহারসহ প্রয়োজনীয় সব ধরনের পরামর্শ ও নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।
প্রকাশক : সোহেল রানা সম্পাদক: আব্দুস সামাদ সায়েম
©২০১৫-২০২৫ সর্বস্ত্ব সংরক্ষিত । তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় কর্তৃক নিবন্ধনকৃত (নিবন্ধন নং-২১০)