
দেশবরেণ্য শিক্ষক, সাদা মনের আলোকিত ব্যক্তিত্ব, গবেষক, চৌকস সঞ্চালক, আন্তর্জাতিক শিক্ষা পরিমন্ডলের একজন স্বীকৃত বিদ্যান এবং সর্বোপরি সলঙ্গা অঞ্চলের গর্বিত সন্তান এ. এম জহিরুল ইসলাম বকুল। তাঁর বর্নাঢ্য জীবনের পরতে পরতে রয়েছে কেবলি স্বপ্ন জয়ের অবিনাশী গান-শেকড় থেকে শিখরে ওঠার সাফল্যমন্ডিত ইতিবৃত্ত যা কিনা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের জীবন আদর্শের অনুকরণীয়, অনুস্মরণীয় অপরিহার্য অনুষঙ্গ হিসেবে কালজয়ী অধ্যায়। পাঠকদের সাথে সেই স্বপ্ন সারথীর জীবনালেখ্যের চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো।
চলনবিল বিধৌত পল্লী জনপদ সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলার সলঙ্গা থানাধীন দক্ষিন পুস্তিগাছা গ্রামে ১৯৬৫ সালের ২ জানুয়ারি এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জনাব এ.এম. জহিরুল ইসলাম বকুল জন্ম গ্রহণ করেন।তাঁর পিতা বাহাদুর আলী ও মাতা জরিনা বেগম।বাবা পেশায় একজন স্কুল শিক্ষক ও মাতা গৃহিণী ছিলেন।ছয় ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়।
জনাব জহিরুল ইসলাম নিজ গ্রামে প্রাথমিক শিক্ষার গণ্ডি পেরিয়ে ধরাইল উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রথমে ভর্তি হন।পরে উন্নত মানের শিক্ষা অর্জনের জন্য ১৯৭৮ সালে বিজ্ঞান বিভাগে ৯ম শ্রেণিতে সলঙ্গা ইসলামিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন।১৯৮০ সালে রাজশাহী বোর্ডের অধীনে সলঙ্গা ইসলামিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে ১ম বিভাগে এসএসসি পাশ করেন।অতঃপর ঢাকা তিতুমীর সরকারি কলেজ থেকে ১৯৮২ সালে এইচএসসি, ১৯৮৫ সালে ঢাকা কলেজ থেকে রসায়নে স্নাতক (অনার্স) এবং ১৯৮৭ সালে ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয় থেকে রসায়নে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তিতে তিনি ১৯৮৯ সালে ডিপ্লোমা ইন কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পরীক্ষায় ১ম বিভাগে ১ম স্থান অর্জন করেন।
জনাব জহিরুল ইসলাম ১৯৮৯ সালেই খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে ঢাকা পলিটেকনিকে যোগদান করেন।অতঃপর ১৯৯০ সালে বিসিআইতে উপ-সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগদান করেন।কিন্তু তিনি শিক্ষকতার নেশায় ১৯৯৩ সালে পিএসসিতে পরীক্ষা দিয়ে ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে জুনিয়র ইন্সট্রাক্টর কেমিক্যাল পদে নিয়োগ পেয়ে যোগদান করেন।
দক্ষ শিক্ষক হতে হলে পড়াশোনা ও প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই।তাই তিনি অ্যাডভান্স প্রশিক্ষণের জন্য সরকারি স্কলারশিপ নিয়ে এক বছরের জন্য জার্মানিতে চলে যান। পরবর্তীতে Teaching Profession এ উচ্চতর ডিগ্রির জন্য Technical Teachers Training College (TTTC) তে ভর্তি হন।সেখান থেকে ২০০৩ সালে ডিপ্লোমা ইন টেকনিক্যাল এডুকেশন বিভাগে ১ম বিভাগে ১ম স্থান এবং ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের অধীনে ২০০৬ সালে বিএসসি ইন টেকনিক্যাল এডুকেশন (মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং)-এ ১ম শ্রেণিতে ১ম স্থান অর্জন করেন।
জনাব জহিরুল ইসলাম ২০১২ সালে পদোন্নতি পেয়ে ওয়ার্কশপ সুপারিন্টেন্ডেন্ট (কেমিক্যাল এন্ড ফুড) পদে যোগদান করেন। এরপরও তিনি থেমে থাকেননি। স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে ২০১৩ সালে ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড টেকনোলজি বিষয়ে M.Sc in Engineering ডিগ্রি অর্জন করেন।অতঃপর তিনি ২০১৭ সালে TVET উপর Study & Research এর কাজে মনোনিবেশ করেন এবং ২০২০ সালে Technical Education (CBT&A)-তে Ph.D ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর ৩টি Research Paper International Journal এ প্রকাশিত হয়েছে। অনলাইনে সার্চ দিয়ে স্টাডি এবং তথ্য সংগ্রহ করা যায়।
জনাব জহিরুল ইসলাম Professional Development এর ক্ষেত্রেও সর্বদা সচেষ্ট ছিলেন। ২০১০ সালে TVET Reform Project এর মাধ্যমে যাত্রা শুরু হয়ে আজও চলমান রয়েছে। তিনি NTVQF এর আওতায় ফুড সেফটি এন্ড হাইজিন এ লেভেল-১, বেকিং এ লেভেল-২, ফুড প্রসেসিং এন্ড কোয়ালিটি কন্ট্রোল এ লেভেল-১, ২, ৩, ইন্ডাস্ট্রি এসেসর লেভেল-৪, ট্রেইনার এন্ড এসেসর মেথডোলজি লেভেল-৪, Teachers Training Methodology (CBT&A, L-5) Master Trainer এবং Life Skills এর উপর মাস্টার ট্রেইনার ট্রেনিং গ্রহন ও সার্টিফিকেট অর্জন করেন।
জনাব জহিরুল ইসলাম ২০২২ সালে চিফ ইনস্ট্রাক্টর ও বিভাগীয় প্রধান (কেমিক্যাল ও ফুড) হিসেবে পদোন্নতি লাভ করে দায়িত্ব পালন করেন। অতঃপর ২০২৩ সালে ADB অর্থায়নে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের অধীন NSDA তে Curriculum Specialist হিসেবে SEIP Project-এর মাধ্যমে Offer পান এবং ৩০ বছর চাকুরী পূর্ণ করে সরকারি চাকরি থেকে Early PRL নিয়ে Consultant হিসেবে যোগদান করেন।
জনাব জহিরুল ইসলাম একজন দক্ষ লেখক, সম্পাদক ও উপস্থাপক।তিনি ডিপ্লোমা ইন কেমিক্যাল ও ফুড টেকনোলজির ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য কারিগরি বোর্ডের ১৫-১৬টি পাঠ্যবই লিখেছেন এবং NTVQF এর আওতায় বিভিন্ন অকুপেশনে ১০-১২টি বই (CBLM) এর লেখক ও সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সর্বশেষ তিনি ২০২২-২০২৩ সেশনে এস এস সি (ভোকেশনাল) এর ২টি বই সম্পাদনা করেছেন যা NCTB কর্তৃক প্রকাশিত হয়েছে এবং সারা দেশে এসএসসি (ভোকেশনাল) এর পাঠ্যবই হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে।
জনাব ইসলাম বিভিন্ন International Donar Agency এবং Organization এর সাথে কাজ করা এবং NSDA তে Curriculum Specialist হিসাবে অভিজ্ঞতা অর্জনের কারণে আবারো ADB অর্থায়নে SICIP Project-এ Process Expert (Consultant) হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। বর্তমানে সেখানে তিনি Skills Manpower Development & Employment নিয়ে কাজ করছেন। দেশের বেকার জনগোষ্ঠিকে দক্ষতা প্রদান ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখছেন।।
সভা, সেমিনার, ওয়ার্কশপ ও ট্রেনিং সেশনে জনাব জহিরুল ইসলাম সব সময় সরব থাকেন। কখনো অংশ গ্রহণকারী, কখনো উপস্থাপক, কখনো ব্যবস্থাপক হিসেবে। Trainer হিসেবে তিনি বেশি পারদর্শী। Competent Person হিসেবে তিনি সরকারি ভাবে জার্মানী, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও চীনে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং সার্টিফিকেট অর্জন করেন।এছাড়া তিনি ফ্রান্স,সুইজারল্যান্ড,অস্ট্রিয়া,লুক্সেমবার্গ, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস ও ভারত ভ্রমণ করেন।
একজন দক্ষ সংগঠক হিসেবে জনাব জহিরুল ইসলাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।তিনি বাংলাদেশ পলিটেকনিক শিক্ষক সমিতির একজন সক্রিয় সদস্য এবং ৩ বার সাধারণ সম্পাদক ও সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে সুনামের সহিত দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া তিনি Honorary Director (TVET) IDEB Research & Technological Institute, Research Fellow, IDEB Study & Research Cell, Secretary & Rover Scout Leader, DPI Rover Scout Group, প্রাক্তন প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক, কেমি ও খাদ্যপ্রযুক্তি ছাত্র সংসদ, সাবেক সাধারণ সম্পাদক “বনানীসংঘ” হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি স্কুল জীবন থেকেই লেখাপড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও খেলাধুলার সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
বর্তমান নব প্রজন্মের অনুপ্রেরণা ও আদর্শ জনাব জহিরুল ইসলাম বকুল।তাঁর এই কীর্তি অর্জন সম্ভব হয়েছে একান্ত প্রবল ইচ্ছা শক্তি ও পজেটিভ চিন্তার কারণে।ব্যক্তি জীবনে তিনি সৎ, নিষ্ঠাবান, প্রচার বিমুখ ও আত্নকেন্দ্রীক একজন জনদরদি মানুষ। তাঁর মত মানুষ বর্তমান সমাজে খুবই প্রয়োজন।
মহান রব্বে কারীমের নিকট আমরা তাঁর সুস্থতার সহিত দীর্ঘ নেক হায়াত ও সর্বাঙ্গীন মঙ্গল কামনা করি।
লেখকঃ শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক
প্রকাশক : সোহেল রানা সম্পাদক: আব্দুস সামাদ সায়েম
©২০১৫-২০২৫ সর্বস্ত্ব সংরক্ষিত । তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় কর্তৃক নিবন্ধনকৃত (নিবন্ধন নং-২১০)