‘স্বাধীনতার পর এবার প্রতিমন্ত্রী পেল জয়পুরহাট’’। স্বাধীনতার পর এই প্রথম জয়পুরহাট-২ আসন জেলার কালাইয়ের একজন মানুষ মন্ত্রিসভায় জায়গা পেলেন এ খবর ছড়িয়ে পড়তেই জয়পুরহাট-২ আসনের গ্রামেগঞ্জে যেন আনন্দের বয়ছে। বিশেষ করে কালাই উপজেলার মাত্রাই ইউনিয়নের বলিশিব সমুদ্র গ্রামে এখন যেন উৎসবের আমেজে ভরপুর। গ্রামের মানুষ গর্ব করে বলছেন, ‘হ্যামারেগে কালাইয়ের ছল এখন মন্ত্রী, হ্যামরা অনেক খুশি’’।
সাবেক সচিব আব্দুল বারী ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের হবিবুর রহমান হলে পড়াশোনাকালীন তিনি ছাত্র সংসদের সহ-ক্রীড়া সম্পাদক নির্বাচিত হন। শহীদ জিয়ার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে যুক্ত হন তিনি। পরবর্তীতে বিসিএসের মাধ্যমে প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দিয়ে দীর্ঘ কর্মজীবন মাঠ প্রশাসন থেকে নীতিনির্ধারণী পর্যায় পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন তিনি। মানিকগঞ্জ ও ঢাকা জেলার জেলা প্রশাসক, ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার এবং জাতীয় পুষ্টি কর্মসূচির নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন তার অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করেছে।
কর্মরিজীবনেও তাকে পড়তে হয়েছে নানা প্রতিকূলতার মুখে । ২০০৭ সালে ওএসডি করা হয় এবং অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব থাকা অবস্থায় অফিসে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়। পরে বিভিন্ন মামলায় জড়ানো হয় তাকে। দীর্ঘ সময় ওএসডি থাকার পর ২০১৪ সালে পিআরএল এবং ২০১৫ সালে পূর্ণ অবসরে যান। তবে অন্তর্বর্তী সরকার তার বিরুদ্ধে থাকা সব মামলা প্রত্যাহার করে ২০২৫ সালের এপ্রিলে আর্থিক সুযোগ-সুবিধাসহ সচিব পদে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেয়।
এরপর আব্দুল বারী সক্রিয় হয়ে ওঠেন রাজনৈতিক অঙ্গনে । বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল তাকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়পুরহাট-২ আসন থেকে মনোনয়ন দেন। প্রথমবারের মতো নির্বাচনে অংশ নিয়েই তিনি ৬৫ হাজার ৫৪৮ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হন। এলাকায় ‘ডিসি বারী’ নামে পরিচিত এই প্রশাসক নির্বাচিত হওয়ার পর এমপি হয়ে মাত্র ৬ ঘণ্টার ব্যবধানে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন আব্দুল বারী।
অবসরের পর কিছুদিন আড়ালে থাকলেও গত ১বছরে এলাকায় নিয়মিত সময় দেন তিনি। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মাদরাসা, রাস্তা-কালভার্ট নির্মাণসহ বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা তাকে মানুষের কাছে আরও গ্রহণযোগ্য করে তোলে। বিশেষ করে আলু মৌসুমে কৃষকের সার সংকট নিরসনে ভূমিকা রাখায় কৃষকদের মাঝে তার প্রতি আস্থা তৈরি হয়।
প্রচারণার সময় বড় মিছিলের পরিবর্তে তিনি উঠান বৈঠক ও ঘনিষ্ঠ আলাপচারিতায় জোর দেন । ইউনিয়নভিত্তিক মতবিনিময় সভা ও তরুণ নেতা-কর্মীদের নিয়ে সমন্বয় টিম গঠন তার নির্বাচনি কৌশলের অংশ ছিল। ফলে গ্রামাঞ্চলে বড় ব্যবধানে এগিয়ে থেকে জয়ের মালা নিশ্চিত করেন।
বলিশিব সমুদ্র গ্রামের ৮০ বছর বয়সি রহিমা বেওয়া আবেগ আপ্লুত কণ্ঠে বলেন, ‘বাবা, স্বাধীনতার পর এত বছর পার হইছে, কিন্তু হ্যামার এলাকা থেইকা কোনোদিন মন্ত্রী হইল না। আজ হ্যামারেগে কালাইয়ের ছল মন্ত্রী হইছে। এইডা হ্যামরা অনেক খুশি। আল্লাহ ওনারে ভালো রাখুক, গরিব মানুষরে দেখুক’। তার কাঁপা-কাঁপা কণ্ঠ ছিল আশার মিশ্রণ আর গর্বে পরিপূর্ণ ।
কালাই উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো: ইব্রাহিম হোসেন মণ্ডল বলেন, নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য আব্দুল বারী নির্বাচনের পরপরই দলীয় নেতা-কর্মীদের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন এবং সেখানে সংগঠনের শৃঙ্খলা রক্ষা ও ঐক্য বজায় রাখার বিষয়ে কঠোর বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেন, আব্দুল বারী শুধু আমাদের এমপি নন, তিনি এখন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী। এটি শুধু কালাই নয় এটি জয়পুরহাটবাসীর জন্য গর্বের বিষয়।
কালাই উপজেলার স্থানীয় নেতাকর্মীরাও দারুনভাবে উচ্ছ্বসিত। তারা মনে করছেন, প্রশাসনিক দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও ব্যক্তিগত সততার ভাবমূর্তি তাকে ভোটারের কাছে গ্রহণযোগ্য করেছে।
এবিষয়ে জানতে চাইলে নবনির্বাচিত প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী বলেন, তিনি প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ জয়পুরহাটবাসীর প্রতি চীর কৃতজ্ঞ। প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার সর্বোচ্চ ব্যবহার করে এলাকার উন্নয়নে কাজ করবেন বলেও জানান এই নবনির্বাচিত প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী।
স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো কালাইয়ের সন্তান প্রতিমন্ত্রী হওয়ায় সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা এখন অনেক। গ্রামের চায়ের দোকান থেকে হাটবাজার সবখানেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু একটাই নাম ডিসি আব্দল বারী। মানুষের আশা, তাদের এলাকার এই সন্তান স্থানীয় উন্নয়ন ও সুশাসনের ক্ষেত্রে নতুন নতুন আলোর পথ দেখাবে এমনটাই প্রত্যাশা জয়পুরহাটবাসাীর।
উল্লেখ্য, মরহুম আব্দুল আলীম একজন রাজনীতিবিদ এবং সমাজসেবক ছিলেন।তিনি ১৯৭৯ সালে বগুড়া-১ থেকে সংসদ সদস্য পরে জয়পুরহাট-১ আসন থেকে ২ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৭৮ সালে তিনি জিয়াউর রহমান সরকারের প্রথমে বস্ত্রমন্ত্রী এবং পরে যোগাযোগ মন্ত্রী ছিলেন। জয়পুরহাট জেলা বিএনপির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও ছিলেন তিনি। ৩০ আগষ্ট, ২০১৪ সালে মৃত্যু বরণ করেন।
প্রকাশক : সোহেল রানা সম্পাদক: আব্দুস সামাদ সায়েম
©২০১৫-২০২৫ সর্বস্ত্ব সংরক্ষিত । তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় কর্তৃক নিবন্ধনকৃত (নিবন্ধন নং-২১০)