ডার্ক ওয়েবের অন্ধকারে ছড়িয়ে পড়া কিছু ছবি। পরিচয়হীন এক কিশোরী। নাম দেওয়া হয়েছিল লুসি। তাকে খুঁজে পেতে গিয়ে প্রায় দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের অভিজাত ইউনিটের কর্মকর্তা গ্রেগ স্কয়ার। শেষ পর্যন্ত একটি ইটই খুলে দেয় বহু বছরের নির্যাতনের জট।
গ্রেগ স্কয়ার, হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের ওই ইউনিটের সদস্য। তাদের কাজ, শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হলে তার অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা করা। লুসির অস্বস্তিকর ছবি ডার্ক ওয়েবে ছড়িয়ে পড়ছিল। এমন এক এনক্রিপ্টেড জায়গা, যেখানে বিশেষ সফটওয়্যার ছাড়া প্রবেশ করা যায় না। অপরাধীরা ছবির শনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য ছেঁটে ফেলত বা বদলে দিত, যাতে তাদের ট্র্যাক করা না যায়। ফলে মেয়েটির পরিচয় বা অবস্থান বের করা প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে।
তবে ছবিগুলো বিশ্লেষণ করতে গিয়ে স্কয়ার ও তার দল কিছু সূক্ষ্ম বিষয় লক্ষ্য করেন। লাইট সকেট, বৈদ্যুতিক আউটলেট দেখে তারা ধারণা করেন, লুসি উত্তর আমেরিকায় রয়েছে। এরপর তারা বিছানার চাদর, পোশাক, খেলনা পুতুল, দৃশ্যমান প্রতিটি বস্তু খুঁটিয়ে দেখা শুরু করেন।
কয়েকটি ছবিতে একটি সোফা চোখে পড়ে, যা সারা দেশে নয়, বরং নির্দিষ্ট একটি অঞ্চলে বিক্রি হতো। সম্ভাব্য ক্রেতার সংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার। তদন্তের সেই পর্যায়ে তারা যুক্তরাষ্ট্রের ২৯টি অঙ্গরাজ্য নিয়ে কাজ করছিলেন। হাজার হাজার ঠিকানা যাচাই করা ছিল কঠিন কাজ।
ঠিক তখনই সামনে আসে লুসির শোবার ঘরের উন্মুক্ত ইটের দেয়াল। স্কয়ার গুগলে খোঁজ করে ব্রিক ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ছবিটি ইট বিশেষজ্ঞদের কাছে পাঠানো হয়। সাড়া দেন জন হার্প, যিনি ১৯৮১ সাল থেকে ইট বিক্রির সঙ্গে যুক্ত।
হার্প ছবিতে ইটের রঙের গোলাপি আভা, চারকোল প্রলেপ, আট ইঞ্চির মডুলার আকার, সমকোণী প্রান্ত দেখে শনাক্ত করেন এটি ফ্লেমিং আলামো। তার ভাষ্য, ষাটের দশকের শেষভাগ থেকে আশির দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত এই ইট তৈরি হয়েছে। তিনি আরও জানান, ইটটি ভারী, আর ভারী ইট খুব দূরে যায় না।
এই তথ্যই তদন্তে মোড় ঘুরিয়ে দেয়। দলটি সোফা ক্রেতাদের তালিকা থেকে দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত হার্পের কারখানা থেকে ১০০ মাইলের মধ্যে থাকা গ্রাহকদের চিহ্নিত করে। তালিকা নেমে আসে ৪০ বা ৫০ জনে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ঘেঁটে ফেসবুকে লুসির একটি ছবি পাওয়া যায়। পাশে এক প্রাপ্তবয়স্ক নারী, সম্ভবত ঘনিষ্ঠ আত্মীয়।
তদন্তকারীরা ওই নারীর ঠিকানা খুঁজে বের করেন। সেখান থেকে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ঠিকানা যাচাই করা হয়। সরাসরি বাড়ি বাড়ি না গিয়ে সম্ভাব্য বাড়িগুলোর ছবি পাঠানো হয় জন হার্পের কাছে। তিনি বাড়ির নির্মাণশৈলী দেখে সম্ভাবনা যাচাই করেন।
অবশেষে একটি ঠিকানা চিহ্নিত হয়, যেখানে ফ্লেমিং আলামো ইট থাকার সম্ভাবনা ছিল এবং সেটি সোফা তালিকাতেও ছিল। রাষ্ট্রীয় রেকর্ড, ড্রাইভিং লাইসেন্স, স্কুলের তথ্য যাচাই করে নিশ্চিত হওয়া যায়, সেখানে লুসি ও তার মায়ের প্রেমিক থাকতেন। ওই ব্যক্তি ছিলেন দোষী সাব্যস্ত যৌন অপরাধী।
কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই স্থানীয় হোমল্যান্ড সিকিউরিটি এজেন্টরা তাকে গ্রেপ্তার করে। ছয় বছর ধরে লুসির ওপর নির্যাতন চালানো ওই ব্যক্তিকে পরে ৭০ বছরের বেশি কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
গত গ্রীষ্মে গ্রেগ প্রথমবারের মতো লুসির সঙ্গে দেখা করেন। এখন তার বয়স বিশের কোঠায়। লুসি জানান, চারপাশের সহায়তার কারণেই তিনি এখন নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলতে পারছেন। নির্যাতনের সময় তিনি মনপ্রাণ দিয়ে প্রার্থনা করতেন, যেন এটি শেষ হয়।
সূত্র: বিবিসি
প্রকাশক : সোহেল রানা সম্পাদক: আব্দুস সামাদ সায়েম
©২০১৫-২০২৫ সর্বস্ত্ব সংরক্ষিত । তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় কর্তৃক নিবন্ধনকৃত (নিবন্ধন নং-২১০)