
প্রায় দেড় যুগেরও বেশি ধরে দেশের বাহিরে অবস্থান করছেন মোহাম্মদ মোক্তার হোসেন সরকার। সেখানে একটি চাকরী করেন তিনি। কিশোর বয়সে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন মোক্তার হোসেন। পালন করেছেন মোহাম্মদপুর থানা ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্ব। দেশে না থাকলেও আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে তার বিরুদ্ধে। মোক্তার হোসেনকে ছাত্রলীগের নেতা দেখিয়ে জুলাই ছাত্র আন্দোলনে গুলি চালানোর অভিযোগ আনা হয়। একইভাবে হত্যাচেষ্টা মামলা হয়েছিল সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী জেড আই খান পান্নার বিরুদ্ধে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের সঙ্গে তাকেও করা হয় আসামি। ঘটনাটি নিয়ে তোলপাড় শুরু হলে এই আইনজীবী মামলা থেকে অব্যাহতি পান।
কিন্তু সবাই তো আর আইনজীবী পান্নার মতো প্রভাবশালী নন। তাই এজাহারে নাম উঠে গেলে মামলা-বাণিজ্যের হয়রানির শিকার হতে হয় তাদের। যেমনটা হচ্ছেন মোহাম্মদ মোক্তার হোসেন সরকার। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মামলার জোয়ার ওঠে দেশ জুড়ে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন এমন হাজার হাজার মানুষকে আসামি করা হয় অনেক মামলায়। মূলত হয়রানি আর বাণিজ্য করাই এসব মামলার উদ্দেশ্য।
ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মূলত মামলা-বাণিজ্য হচ্ছে চারভাবে। এজাহারে যাদের নাম এসেছে, টাকার বিনিময়ে তাদের নাম বাদ দিতে ব্যস্ত এক পক্ষ। আরেক পক্ষ ভুক্তভোগী পরিবারকে ভুল বুঝিয়ে মামলা-বাণিজ্য করছে। আবার পূর্বশত্রুতা কিংবা ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বেও মামলায় জড়ানো হচ্ছে কাউকে কাউকে।
তদন্তের স্বার্থে মামলার তথ্য গোপন রেখে ভুক্তভোগী জানান ‘মামলার বিষয়ে প্রথমে শুনে তো আকাশ থেকে পড়ার অবস্থা। বিভিন্ন মাধ্যমে খোজ নিয়ে জানতে পারি, পুর্বশত্রুতার জের ধরে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ দেয়া হয়েছে।'
আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতেই মিথ্যা মামলায় জড়ানো হচ্ছে অভিযোগ করে মোক্তার হোসেন বলেন, ‘একসময় ছাত্রলীগের রাজনীতি করেছি, ২০০৭ সাল থেকে আমি দেশের বাইরে থাকি।এর মধ্যে আর দেশেই আসা হয়নি, অথচ জুলাই আন্দোলনের হত্যার অভিযোগ দেয়া হল আমার বিরুদ্ধে। আমি এই নতুন সরকারের কাছে সুষ্ঠু বিচার চাই।’
ছাত্র-জনতার আন্দোলন ঘিরে দেশে ভুয়া মামলার কথা স্বীকার করেছিলেন স্বয়ং সাবেক আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল। এ জন্য সতর্ক ও হুঁশিয়ারিও করেন তিনি। ভুয়া মামলার বাদীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বললেও সরকারের তরফ থেকে শক্ত কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
আর ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার সাজ্জাত আলী একটি অনুষ্ঠানে বলেছিলেন- জুলাই অভ্যুত্থানে মামলা-বাণিজ্যের অভিযোগ আসছে যাদের নামে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছেন তারা। এই বাণিজ্যের সঙ্গে পুলিশও জড়িত। ইতিমধ্যে একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে বলেও জানিয়েছিলেন কমিশনার।
পুলিশের দাবি, এসব মিথ্যা মামলায় আসামি গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে সতর্ক তারা। মামলায় নাম থাকলেই গণহারে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না। যাচাই-বাছাই করে তবেই গ্রেপ্তার করা হয় আসামি। অপরদিকে বিভিন্ন গনমাধ্যমে দেখা যায়, অনেক মামলায় আসামিকে চেনেন না বাদী। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব মামলায় নাম দেওয়ার ক্ষেত্রে বাদী কার দ্বারা প্ররোচিত হয়েছেন সেটি বের করা দরকার। তাহলে মামলা-বাণিজ্যের প্রবণতা কমতে পারে।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে আইনজীবী আবু বকর সিদ্দিক বলেন, ‘অনেক সময় মামলার বাদী আদালতে এসে বলছেন তিনি আসামিকে চেনেন না। তার মানে মিথ্যা মামলায় নিরীহ মানুষকে ফাঁসানো হচ্ছে। বাদী কার প্ররোচনায় মামলায় নামটি দিয়েছে, সেটি উদঘাটন করতে হবে।’ এই ধরনের মামলা বাণিজ্য দ্রুত বন্ধ করার তাগিদ দেন তিনি।
জাতীয় নাগরিক কমিটি বলছে, জুলাই বিপ্লব পরবর্তী বাংলাদেশে এই ধরনের মামলা দুঃখজনক। তারা চায় কেউ যাতে মামলা-বাণিজ্যের শিকার না হন।
প্রকাশক : সোহেল রানা সম্পাদক: আব্দুস সামাদ সায়েম
©২০১৫-২০২৫ সর্বস্ত্ব সংরক্ষিত । তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় কর্তৃক নিবন্ধনকৃত (নিবন্ধন নং-২১০)