কাজিপুর (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি :
/ ৯
বার দেখা হয়েছে
আপডেট :
মঙ্গলবার, ৩ মার্চ, ২০২৬
শেয়ার করুন
সিরাজগঞ্জের কাজিপুরে সমাজসেবামূলক সংগঠন ভয়েস অব কাজিপুর-এর সম্মানিত প্রধান উপদেষ্টা প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেনের উদ্যোগে প্রায় ১২০০ রোজাদারদের সম্মানে এক বিশাল ইফতার মাহফিল ও দোয়া অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মঙ্গলবার বিকেলের উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বাংলাবাজার মার্কায মসজিদ প্রাঙ্গণে এক অনন্য মানবিক মিলনমেলায় পরিণত হয়।
মসজিদ প্রাঙ্গণে সমবেত হতে থাকেন, তখন পুরো পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে এক অনাবিল প্রশান্তি ও আধ্যাত্মিক আবহ।
এই আয়োজন শুধু একটি ইফতার মাহফিল ছিল না; এটি ছিল ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও মানবিক বন্ধনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। স্থানীয়ভাবে ‘প্রচারবিমুখ মানবতার ফেরিওয়ালা’ হিসেবে পরিচিত প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন দীর্ঘদিন ধরেই নীরবে-নিভৃতে সমাজের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে আসছেন। ব্যক্তিগত শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে তিনি যে মহৎ উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন, তা উপস্থিত সকলের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে গভীরভাবে।
অনুষ্ঠানের মূল প্রতিপাদ্য ছিল তাঁর সদ্যপ্রয়াত কন্যা শোয়াইবা শার্লিনের অকালপ্রয়াণে আত্মার মাগফেরাত কামনায় বিশেষ দোয়া। সন্তানের মৃত্যু যে কত বড় বেদনা, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। কিন্তু সেই অসীম শোককে বুকে ধারণ করেও তিনি বেছে নিয়েছেন মানুষের মাঝে ভালোবাসা বিলিয়ে দেওয়ার পথ। ইফতার মাহফিলের আগে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। এরপর বিশেষ মোনাজাতে শোয়াইবা শার্লিনের আত্মার শান্তি কামনা করা হয় এবং মহান আল্লাহর দরবারে তাঁর জন্য জান্নাতুল ফেরদৌস প্রার্থনা করা হয়। মোনাজাতের সময় পুরো মসজিদ প্রাঙ্গণ নিস্তব্ধ হয়ে যায়; অনেকের চোখে দেখা যায় অশ্রু।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। রাজনীতিবিদ, সমাজকর্মী, শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, ব্যবসায়ী এবং এলাকার গুণীজনদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন। এটি যেন হয়ে ওঠে সাম্যের এক চিত্র—যেখানে ধনী-গরিব, বড়-ছোট, দল-মত নির্বিশেষে সবাই একই কাতারে বসে ইফতার গ্রহণ করেন। এমন দৃশ্য আমাদের সামাজিক বন্ধনের শক্তিকে নতুন করে মনে করিয়ে দেয়।
বক্তারা তাঁদের সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেনের মানবিক কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করেন। ভয়েস অব কাজিপুর এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি জনাব আশকার পাইন বলেন, ব্যক্তিগত শোকের মধ্যেও যিনি সমাজের মানুষের কথা ভাবেন, তিনি প্রকৃত অর্থেই একজন মানবিক মানুষ।আজকের এই আয়োজন প্রমাণ করে, মানুষের প্রতি ভালোবাসাই সবচেয়ে বড় শক্তি। সন্তানের স্মৃতিকে তিনি যে মহৎ কাজে রূপ দিয়েছেন, তা আমাদের সবার জন্য অনুকরণীয়।”
ইফতারের সময় যখন আজানের ধ্বনি ভেসে আসে, তখন হাজারো রোজাদার একসঙ্গে দোয়া করে ইফতার শুরু করেন।স্বেচ্ছাসেবকরা নিষ্ঠার সঙ্গে সবার মাঝে ইফতার বিতরণ করেন। পুরো আয়োজন ছিল সুশৃঙ্খল ও পরিপাটি। কারও মধ্যে কোনো ভিড় বা বিশৃঙ্খলা দেখা যায়নি—বরং ছিল পারস্পরিক সহমর্মিতা ও সহযোগিতা।
অনেকেই বলেন, এমন বৃহৎ আয়োজন শুধু আর্থিক সক্ষমতা দিয়ে সম্ভব নয়; প্রয়োজন বিশাল হৃদয়ের। প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন সেই হৃদয়ের পরিচয় দিয়েছেন বারবার। তিনি সবসময় বিশ্বাস করেন, সমাজের কল্যাণে কাজ করাই জীবনের প্রকৃত সার্থকতা। তাঁর কন্যার রূহের মাগফেরাতের উদ্দেশ্যে এই আয়োজন যেন হয়ে উঠেছে এক মানবিক দৃষ্টান্ত, যা ভবিষ্যতেও মানুষকে অনুপ্রাণিত করবে।
স্থানীয় এক শিক্ষক আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “একজন পিতা তাঁর সন্তানের জন্য যা করতে পারেন, তার চেয়ে বড় হলো মানুষের দোয়া অর্জন করা। আজ হাজারো মানুষ তাঁর কন্যার জন্য দোয়া করেছেন—এটাই সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা।” একজন সমাজকর্মী বলেন, “আমরা চাই, এই ধারা অব্যাহত থাকুক। মানবতার এই আলো কাজিপুর থেকে ছড়িয়ে পড়ুক সারা দেশে।”
ইফতার শেষে অনুষ্ঠিত হয় সংক্ষিপ্ত আলোচনা ও পুনরায় দোয়া। সেখানে আলেমরা ধৈর্য ও সবরের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তাঁরা বলেন, আল্লাহ যাকে ভালোবাসেন, তাকে বিভিন্নভাবে পরীক্ষা করেন। সেই পরীক্ষায় ধৈর্য ধারণ করে মানুষের কল্যাণে কাজ করাই প্রকৃত ঈমানের পরিচয়। প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন তাঁর জীবনের কঠিনতম মুহূর্তেও যে ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন, তা সত্যিই অনুকরণীয়।
সমগ্র আয়োজন জুড়ে ছিল আন্তরিকতা ও মানবিকতার স্পর্শ। এটি শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; বরং সামাজিক সম্প্রীতি ও সহমর্মিতার এক অনন্য উদাহরণ। উপস্থিত অনেকেই মনে করেন, এমন উদ্যোগ সমাজে ইতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে দেয়। ব্যক্তিগত বেদনা যখন সমাজের কল্যাণে নিবেদিত হয়, তখন তা হয়ে ওঠে অনন্ত প্রেরণার উৎস।
সবশেষে বলা যায়, কাজিপুর উপজেলার মাএই ইফতার মাহফিল ছিল মানবিকতার এক উজ্জ্বল অধ্যায়। শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর যে শিক্ষা এই আয়োজন দিয়েছে, তা দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। শোয়াইবা শার্লিনের স্মৃতি আজ হাজারো মানুষের দোয়ায় সিক্ত। মহান আল্লাহ যেন তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করেন এবং তাঁর পরিবারকে এই শোক সহ্য করার তৌফিক দান করেন—এই কামনাই ছিল সবার হৃদয়ে।
মানবতার ফেরিওয়ালা প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেনের এই উদ্যোগ প্রমাণ করে—নীরবে করা সৎকর্মই সমাজকে আলোকিত করে। কাজিপুরের আকাশে সেদিন ইফতারের আজানের সঙ্গেমিশে ছিল অশ্রু, দোয়া ও ভালোবাসার এক অপূর্ব সমন্বয়—যা মানবতার ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।