ঐতিহ্যবাহী মেলায় ঘোড়ার হাটে চমক দেখাচ্ছে ‘যুবরাজ’, দাম হাঁকছেন ১১ লাখ। জয়পুরহাট জেলার আক্কেলপুর উপজেলার গোপীনাথপুরে দোলপূর্ণিমা উপলক্ষে বসা শতাব্দীর প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী মেলা আবারও যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। প্রায় ৫১৯ বছরের পুরোনো এই মেলাকে কেন্দ্র করেই জমে উঠেছে বিখ্যাত ঘোড়ার হাট।
দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ঘোড়ার ব্যবসায়ী, ক্রেতা এবং দর্শনার্থীদের পদচারনায় মেলা প্রাঙ্গণ এখন সরগরম। ঘোড়ার ডাক, ক্রেতা-বিক্রেতার দর-কষাকষি এবং সওয়ারিদের প্রদর্শনী সব মিলি মিশে যেন এক প্রাণবন্ত পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে।
উত্তরাঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতি ও সংস্কৃতির সাথে এই মেলার সম্পর্ক এতটাই গভীর ও নিবীর যে, বহু পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এখানে ঘোড়া কেনাবেচার ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। মেলায় ঘোড়ার সংখ্যা মোটামুটি হলেও দর্শনার্থীদের নজর সবচেয়ে বেশি কাড়ছে একটি ধূসর রঙের ঘোড়া, যার নাম রাখা হয়েছে ‘যুবরাজ’। উঁচু ও লম্বা গড়নের এই ঘোড়াটি ভারতীয় তাজি জাতের এবং বয়স প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর।
ঘোড়াটির মালিক নওগাঁর জেলার ধামইরহাট উপজেলার শাহরিয়ার ইসলাম সাগর জানান, তিনি নিজের তত্ত্বাবধানে দীর্ঘদিন ধরে ঘোড়াটিকে প্রশিক্ষণ ও পরিচর্যা করেছেন। দ্রুতগতির জন্য পরিচিত এই ঘোড়াটি বিভিন্ন ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে পুরস্কারও অর্জন করেছেন অনেক। মেলায় ঘোড়াটির দাম হাঁকা হচ্ছে ১১ লাখ টাকা। তবে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ দর উঠেছে সাড়ে ৭ লাখ টাকা। কাঙ্ক্ষিত মূল্য না পাওয়ায় তিনি এখনো ঘোড়াটি বিক্রি করেননি। তার ভাষ্য, ১০ লাখ টাকা পাওয়া গেলে ঘোড়াটি বিক্রি করবেন তিনি।
মেলার মাঠে শুধু ‘যুবরাজ’ নয়, আরও নানা নামের ঘোড়া ঘুরে বেড়াচ্ছে। পঙ্খিরাজ, বাহাদুর, বিজলি, কিরণমালা কিংবা বাংলার রানী এমন সব নামের ঘোড়াগুলোকে সাজানো হয়েছে বাহারি সাজে। ঘোড়াগুলোর দুলকী চাল,গতি ও বুদ্ধিমত্তা দেখিয়ে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছেন বিক্রেতারা। আগ্রহী ক্রেতারা পছন্দের ঘোড়াকে মাঠে দৌড় করিয়ে তার গতি ও সক্ষমতা যাচাই করছেন।
মানভেদে ঘোড়াগুলোর দাম সাধারণত ৮০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত ওঠানামা করছে। তবে উন্নত জাতের বড় ঘোড়াগুলোর দাম অনেক বেশি।
এ মেলা শুধু একটি কেনাবেচার হাট নয়, বরং এটি উত্তরাঞ্চলের একটি ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক মিলনমেলা হিসেবেও পরিচিত। প্রায় পাঁচ শতাব্দীরও বেশি সময় আগে নবাব আলাউদ্দিন হোসেন শাহ এই এলাকায় সফরকালে এক সাধকের আতিথেয়তায় সন্তুষ্ট হয়ে গোপীনাথপুর ও গোপালপুর মৌজার জমি দেবোত্তর সম্পত্তি হিসেবে দান করেছিলেন বলে লোকমুখে প্রচলিত আছে। সেই সময় থেকেই দোলযাত্রা উপলক্ষে এই মেলার শুভ সূচনা হয়। এক সময় এই মেলায় নেপাল, ভুটান এমনকি মধ্যপ্রাচ্য থেকেও উন্নত জাতের ঘোড়া আসত বলে স্থানীয়দের দাবি। ফলে ঐতিহাসিকভাবেই এটি দেশের অন্যতম বড় ঘোড়ার হাট হিসেবে সুপরিচিতি লাভ করে।
বর্তমানে মাসব্যাপী এই মেলার প্রথম দশ দিন মূলত পশুর হাট হিসেবে পরিচিত। ঘোড়ার পাশাপাশি গরু, মহিষ ও ভেড়ার কেনাবেচাও চলে। মেলা প্রাঙ্গণে বিভিন্ন ধরনের দোকান বসেছে, যেখানে কাঠ ও প্লাস্টিকের আসবাবপত্র, ঘর সাজানোর সামগ্রী এবং নানা ধরনের মিষ্টি পাওয়া যাচ্ছে। এই মেলার আরেকটি পুরোনো ঐতিহ্য হলো মাছের আকৃতির বড় মিষ্টি, যার ওজন সাধারণত ২-৪ কেজি পর্যন্ত হয়। তবে পবিত্র রমজান মাস শুরু হওয়ায় এবার মেলায় সার্কাস বা যাত্রাপালার অনুমতি দেওয়া হয়নি।
দেশের ময়মনসিংহ, জামালপুর, টাঙ্গাইল, রাজশাহী, দিনাজপুর জেলা সহ আরও বিভিন্ন জায়গা থেকে ব্যবসায়ীরা ঘোড়া নিয়ে এসেছেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিক্রেতা খাইরুল ইসলাম জানান, তিনি ১৮টি ঘোড়া নিয়ে মেলায় এসেছেন এবং বিক্রিও ভালো হচ্ছে। টাঙ্গাইলের আরিফুল ইসলাম বলেন, ১৩টি ঘোড়া নিয়ে এসেছেন এবং ক্রেতাদের আগ্রহ দেখে তিনি সন্তুষ্ট।
পাবনার রিপন হোসেন প্রায় ৩০ বছর ধরে এই মেলায় আসছেন, এবারও তার তিনটি ঘোড়া ভালো দামে বিক্রি হয়েছে। তবে অনেক ব্যবসায়ী মনে করেন, আগের তুলনায় মেলার জৌলুশ কিছুটা কমে গেছে। আগে ঘোড়দৌড়ের জন্য বিস্তীর্ণ মাঠ থাকলেও এখন তা অনেকটাই সংকুচিত হয়ে গেছে। ফলে ঘোড়ার দৌড় আয়োজন করা কঠিন হয়ে পড়েছে, যা ঘোড়ার বেচাকেনার ওপরও কিছুটা হলেও প্রভাব ফেলছে।
মেলার সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন সক্রিয় রয়েছে বলে উল্লেখ করেন মেলা কমিটির সভাপতি ও স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান জানান, উত্তরবঙ্গের মধ্যে এটি অন্যতম বড় গ্রামীণ মেলা।
নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকেও সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন,আর আর আক্কেলপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহীন রেজা।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা জান্নাত বলেন, গোপীনাথপুরের এই মেলা একটি প্রাচীন ঐতিহ্যের অংশ, তাই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং রমজানের পবিত্রতা বজায় রাখতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর নজরদারি রাখা হচ্ছে,আর এটি চলমান থাকবে মেলা শেষ পর্যন্ত।