বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১১:০২ পূর্বাহ্ন
নোটিশ:
তথ্য ও প্রচার মন্ত্রণালয় নিবন্ধনকৃত অনলাইন নিউজ পোর্টাল দ্য পিপলস্ নিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকে সারা দেশে জেলা প্রতিনিধি নিয়োগ করা হবে। মোবাইল: ০১৭১১-১১৬২৫৭, ০১৭১২-৪০৭২৮২ ' ই-মেইল : thepeopelesnews24@gmail.com

মুচলেকার নামে নেওয়া হয় সই, পরীক্ষা ছাড়াই মাদক গ্রহণের দায়ে দেওয়া হয় ৮৫ জনকে সাজা

অনলাইন ডেস্ক: / ৪৩ বার দেখা হয়েছে
আপডেট : বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬

১৯ অক্টোবর দিবাগত রাতে ভাটারার পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটি-১ আবাসিক এলাকার একটি বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। অভিযানে আটক ৮৫ জনের মধ্যে ২৬ জন নারী। পুরুষদের এক মাস করে কারাদণ্ড এবং এক হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। নারীদের ১৫ দিন করে কারাদণ্ড এবং ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালত মাদক গ্রহণের অভিযোগে তাদের কারাদণ্ড দিয়েছেন। অথচ তারা সেদিন মাদক গ্রহণ করেছিলেন কি না, সেই পরীক্ষা করা হয়নি।

ডিএমপির উত্তরা বিভাগের স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আসাদুজ্জামান ডিআইজির ভাড়া বাসা থেকে আটক ব্যক্তিদের সাজা দেন। ৪০ জনের কাছ থেকে জরিমানা আদায়ের একটি নথিতে অপরাধের জায়গায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর ৩৬(৫) ধারার কথা বলা আছে। ধারাটিতে বলা হয়েছে, মাদক গ্রহণ করে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় জনসাধারণের শান্তি বিনষ্ট করলে, বিরক্তিকর কোনো আচরণ করলে এবং গাড়ি চালালে অনূর্ধ্ব এক বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা হবে।

স্বজনদের অভিযোগ, সাজা দেওয়ার ক্ষেত্রে কেউ নেশাগ্রস্ত ছিলেন কি না, সেটা পরীক্ষা করা হয়নি। ডিবির দায়িত্বপ্রাপ্ত ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘অপরাধ কতটা প্রমাণিত হয়েছে, কিসের ভিত্তিতে সাজা দেওয়া হয়েছে, এটা সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট ভালো বলতে পারবেন। বিচারের দায়িত্ব তো আমাদের না।’

ম্যাজিস্ট্রেট আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, আসামিরা দোষ স্বীকার করায় তাঁদের সাজা দেওয়া হয়েছে। সাজা পাওয়া ব্যক্তিদের স্বজনরা জানিয়েছেন, দোষ স্বীকার করার কথাটি ঠিক নয়। তাঁরা কারাগারে সাজাপ্রাপ্তদের সঙ্গে দেখা করে বিষয়টি জানতে চেয়েছিলেন। কারণ, তাঁরা আপিলের চেষ্টা করছেন। তাঁরা আরও বলছেন, মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়ার কথা বলে একটি কাগজে সই নেওয়া হয়েছিল। অথচ পরে তাঁকে মাদক গ্রহণের দায়ে সাজা দেওয়া হয়।

অভিযানে কারাদণ্ড হওয়া ৮৫ জনের একজন বাদ্যযন্ত্রশিল্পী। তাঁর বাবা একটি সুপরিচিত ব্যান্ডের একজন স্বনামধন্য সদস্য। তিনি দাবি করেন, তাঁর ছেলে অতিরিক্ত ডিআইজির ভাড়া দেওয়া বাসায় গিয়েছিলেন অনুষ্ঠানে বাদ্যযন্ত্র বাজানোর কাজ পেয়ে। তাঁকে ভ্রাম্যমাণ আদালত মাদক গ্রহণের অভিযোগে এক মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন। অথচ তাঁর ছেলে মাদক গ্রহণ করেছিলেন কি না, সেই পরীক্ষা করা হয়নি।

সেই অভিযানে আটকদের সারা রাত দুটি কক্ষে আটকে রাখার পরে ভোরের দিকে ৮৫ জনকে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে আসা হয়। সেখানে তাঁদের সাজা দেওয়া হয়। এর আগে কক্ষের ভেতরে এবং সেখান থেকে আটক ব্যক্তিদের বের করার সময় পুলিশ সদস্যরা ভিডিও করেন।

যেকোনো অভিযানের পর পুলিশকে জব্দ তালিকা তৈরি করতে হয়। ডিবির তৈরি তালিকায় দেখা যায়, অভিযানে ওই বাড়ি থেকে চারটি মদের বোতল উদ্ধার করা হয়েছে। একটি খালি, একটি ভরা এবং দুটি আংশিক ভরা। বাড়িটি থেকে একটি ইয়াবা বড়ি ও ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম এবং একচিলতে পরিমাণ কুশ উদ্ধারের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে ডিবির জব্দ তালিকায়।

অভিযানে নেতৃত্ব দেন ডিবির উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইলিয়াস কবীর। জানতে চাইলে তিনি জানান, পুলিশের ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে নির্দেশনা পাওয়ার পর তাঁরা অভিযান পরিচালনা করেন। সেখানে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে মাদক সেবন ও ডিজে পার্টি করা হতো।

ডিআইজির ভাড়া দেওয়া বাড়িতে অভিযান চালায় ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) উত্তরা ডিভিশনের একটি দল। ডিএমপি ও ডিবি সূত্র, সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের স্বজন এবং অভিযানের সময় উপস্থিত সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাত আটটা থেকে ওই বাড়িতে অতিথিরা যেতে শুরু করেন। রাত ১২টা পর্যন্ত ধাপে ধাপে ৮৫ জন সেখানে উপস্থিত হন। রাত সাড়ে ১২টার দিকে ডিবির ৪০ থেকে ৫০ জনের একটি দল বাড়িটিতে প্রবেশ করে। তখন প্রধান ফটক খোলা ছিল। পুলিশ সদস্যরা ভেতরে ঢুকেই ভবনের বাইরে আড্ডা দেওয়া অতিথিদের কক্ষে যেতে বলেন। পরে সবাইকে জোর করে দুটি কক্ষে ঢোকানো হয়। এতে প্রায় আধা ঘণ্টা সময় লাগে।

জানা গেছে, পুলিশ সদস্যরা বাড়িতে কোথায় কোথায় সিসি (ক্লোজড সার্কিট) ক্যামেরা রয়েছে, তা খুঁজতে থাকেন। ছয়টি ক্যামেরার মধ্যে চারটি খুলে নেওয়া হয়। বাকি দুটির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে মেমোরি কার্ড খুলে নেওয়া হয়। সিসিটিভি ক্যামেরা খোলার পর বাড়িটিতে তল্লাশি চালানো হয়। সূত্র বলছে, প্রথম দফায় কোনো মাদকদ্রব্য পাওয়া যায়নি। এ সময় পুলিশ সদস্যরা উপস্থিত ব্যক্তিদের কাছে মাদকদ্রব্য থাকলে তা জমা দিতে বলেন। কিন্তু কেউ কিছু জমা দেননি। দ্বিতীয় দফায় তল্লাশিতে দুটি খালি মদের বোতল পাওয়া যায়।

এ অভিযান নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। ১. কেন মাদক পরীক্ষা ছাড়া সাজা দেওয়া হলো? ২. সবাইকে দুটি কক্ষে ঢুকিয়ে পুলিশের করা ভিডিও কীভাবে ছড়িয়ে পড়ল? ৩. অতিরিক্ত ডিআইজির বাসার আশপাশের প্লটগুলো ফাঁকা। তাহলে জনশান্তি কীভাবে বিঘ্নিত হলো? ৪. ডিবি কেন অভিযানের আগে ভবনের সিসিটিভি ক্যামেরা খুলে ফেলল, সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজের মেমোরি কার্ড এখন কোথায় এবং তা কেন জব্দ তালিকায় নেই? ৫. পুলিশ অভিযোগ করেছে, বাড়িটিতে ডিজে পার্টি হতো। তাহলে জব্দ তালিকায় ডিজে পার্টির সরঞ্জাম নেই কেন?

বাড়িটির মালিক পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) আবদুল্লাহ আল জহির। তিনি সেটি ভাড়া দিয়েছিলেন। অভিযানের ঘটনা এবং তা সংবাদমাধ্যমে আসার পর আবদুল্লাহ আল জহিরকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। ঘটনাটি নিয়ে গত রবিবার বিবৃতি দিয়েছেন ১০১ জন নাগরিক। ব্লাস্ট, হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস), নারীপক্ষ ও সপ্রাণ যৌথভাবে একটি বিবৃতি দিয়েছে। ঘটনাটি নিয়ে স্বাধীন তদন্তের দাবি উঠেছে।

পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটি পুলিশ কর্মকর্তাদের জন্য সরকারি আবাসন প্রকল্প। ১৪৩ একরের এই প্রকল্পে ১ হাজার ১০০ জনের মতো পুলিশ কর্মকর্তার প্লট রয়েছে। তবে বেশির ভাগই খালি। ডিআইজি আবদুল্লাহ আল জহিরের সাড়ে তিন কাঠার প্লটে ভবনটি তিনতলা। গাছগাছালিতে ভরা প্লটটির সামনে দুই কাঠার মতো ফাঁকা জায়গা রয়েছে। অনুষ্ঠান হয় মূলত এই ফাঁকা জায়গায়। ডিআইজি আবদুল্লাহ আল জহির জানিয়েছেন, তাঁর বাসাটি অনুষ্ঠানের জন্য ভাড়া দেওয়া হতো। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বাসাভাড়া দেওয়ার প্ল্যাটফর্ম এয়ারবিএনবি এবং বাংলাদেশি প্ল্যাটফর্ম ট্রাভেলাতে নিবন্ধিত।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বলেন, দোষ স্বীকার করলেই মাদক মামলায় সাজা দিয়ে দেওয়া যায় না। ডিবি ভয় দেখিয়ে আসামিদের ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে নিতে পারে। ম্যাজিস্ট্রেটের উচিত ছিল ডিবির অভিযোগকে অবিশ্বাস করা। মাদক পরীক্ষা করে প্রমাণ পেলে সাজা দিতে অসুবিধা কোথায়। এখন তো পরীক্ষার সহজ উপায় আছে। তিনি আরও বলেন, ‘ভ্রাম্যমাণ আদালতে জজ, জুরি, এক্সিকিউশনার একই পক্ষ হয়ে যান। ম্যাক্সিমাম ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার হয় না।’

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এহসানুল হক সমাজী বলেন, আসামিদের ছবি বা ভিডিও প্রকাশের ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে যদি এসব ছবি বা ভিডিও ছড়ানো হয়ে থাকে, তাহলে তারা তা করতে পারে কি না, সে প্রশ্ন রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতাগুলো কতটা লঙ্ঘিত হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর