আল্লাহ তাআলা মনুষ্যজাতিকে অপার সম্ভাবনার অধিকারী করে সৃষ্টি করেছেন। সে তার শক্তি ও কালকে অতিক্রম করার অমিততেজে প্রদীপ্ত। মানুষের চেতনস্বভাবে দুটো প্রবণতা সে এমন ধারণ করে, যা আর কারো মাঝে নেই। একটি হলো অজ্ঞেয়কে জ্ঞাত করার সীমাহীন কৌতূহল এবং সেই কৌতূহলোদ্দীপনায় যেকোনো ঝুঁকি নেওয়ার অপরিমেয় মানবশক্তি সে তার মাঝে ধারণ করে।
অজ্ঞেয়কে জ্ঞাত করতে, অজানাকে আয়ত্তে আনতে সে জেনেবুঝে যেকোনো ঝুঁকি গ্রহণ করতে পিছপা হয় না। অজ্ঞেয়কে জ্ঞাত করার, অধরাকে ধরার বিপুল অন্বেষা-কাতরতায় শঙ্কাকুল জঙ্গমে আহবে ঝাঁপিয়ে পড়তেও তার দ্বিধা হয় না। সমুদ্র ঊর্মিমালার টুঁটি চেপে ধরতেও সে শঙ্কাকাতরতায় ভোগে না। এই অন্বেষা কৌতূহল এমন এক মহাশক্তি, যা মানুষকে নব নব আবিষ্কারে প্রণোদনা দেয়।
এই বোধই তার উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি।
দ্বিতীয়টি হলো সীমাতিক্রম করে যাওয়ার মহাপ্রবণতা। মানুষ সে তার সব সীমা ভেঙে ফেলে এগিয়ে যায়। নিজেকে সীমিত করে রাখার, সীমার গণ্ডিতে আবদ্ধ করে রাখার মানসিকতা তার নেই।
সামনে যেকোনো প্রাচীরই থাকুক না কেন, তা ডিঙিয়ে ওপারে চলে যাওয়ার নিদারুণ প্রেরণাসমৃদ্ধ সে। শারীরিক শক্তি ও ক্ষমতায় যতই সে দুর্বল হোক না কেন, সীমাধীন হোক না কেন, মনন তার হামেশাই অসীমচারী। পাহাড়, সাগর, মরুবিয়াবান, ভূমণ্ডলের সব সীমা ছাড়িয়ে মহাকাশ-সীমালঙ্ঘনেও সে তৎপর। আকাশসীমা পাড়ি দিয়ে ‘সিদরাতুল মুনতাহা’, সর্বশেষ সীমান্ত বদরী বৃক্ষধাম, যা অতিক্রমণে মালায়িকাশ্রেষ্ঠ জিবরাইল মহানুরানী তেজে ভস্ম হওয়ার আশঙ্কায় জড়সড়, সেখান থেকেও আরো অসীম সীমাহীনতায় ধেয়ে যায় মানবকুলশ্রেষ্ঠ অনায়াসে। সীমাহীন এক অতলান্ত অঙ্গহীন এক আলিঙ্গন প্রত্যাশায় মাতোয়ারা সে।
মহাঅসীমের সীমাহীনতায় মিলন-আবেশে মিশে যায় সে। এই মহাপ্রবণতা আর কারো নেই।
এ দুটো স্বভাবগুণই ছিল যদ্দরুন মনুষ্যজাতি আল্লাহপ্রদত্ত মহা আমানতের বোঝা কাঁধে তুলে নিয়েছিল অবহেলায়, কোনো চিন্তা না করেই। যখন পৃথিবীর সব কিছু পাহাড়, পর্বত, আকাশমালা ও দ্যুলোক ভূলোকের সব কিছু অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করল, স্বীয় অক্ষমতা সত্ত্বেও তখন তা বহনে এগিয়ে এসেছিল এই মানুষই।
কোরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে—আমি তো পেশ করেছিলাম এই আমানত আকাশমণ্ডলী, জমিন ও পর্বতমালার কাছে; কিন্তু তারা তা বহন করতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করল এবং তাতে শঙ্কাবোধ করল। অনন্তর মানুষ তা গ্রহণ করল, সে তো ‘জালুম’ (অতি সীমাতিক্রমকারী), ‘জাহুল’ (অতি অজ্ঞ, মূর্খ)।
(সুরা : আল আহজাব, আয়াত : ৭২)
সে তো ছিল ‘জালুম’, বড়ই সীমাতিক্রমকারী। কোনো সীমাবদ্ধতাই তাকে রুদ্ধ করতে পারে না। আর সে তো বড়ই ‘জাহুল’, নিতান্ত অজ্ঞ। অজ্ঞাত বিষয়ে ঝুঁকি নিয়েও ঝাঁপিয়ে পড়ে সে।