মাদক ও নেশাদ্রব্য। সমাজ ধ্বংসের ভয়ংকর হাতিয়ার। মাদকের ছোবলে ব্যক্তি, পরিবার সমাজ-সর্বত্রই বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়ে। এই মাদক ও নেশাদ্রব্যের আঘাতে কত সম্ভাবনা মুকুলেই ঝরে যায়। কত পরিবার চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে হয়ে পড়ে। তাই মানববিধ্বংসী ভয়ংকর এই মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে ইসলাম। নবীজি (সা.) কথা ও কাজে মাদক নির্মূলে যথার্থ কার্যকরী পন্থা অবলম্বনের নির্দেশনা দিয়েছেন।
যা কিছু ক্ষতিকর তা নিষিদ্ধ
ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের ক্ষতি করে এমন সবকিছুকে ইসলাম হারাম ও নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। আর যা কিছু মানুষের জন্য উত্তম এবং উপকারী এমন সব বিষয়কে করেছে হালাল ও বৈধ। বস্তুত আল্লাহ যা কিছু হারাম করেছেন, মানুষকে তার উত্তম বিকল্প প্রদানও করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘তিনি মুহাম্মদ (সা.) তাদের জন্য উৎকৃষ্ট বস্তু হালাল করবেন ও নিকৃষ্ট বস্তু হারাম করবেন এবং তাদের থেকে তাদের ভার ও গলার বেড়ি নামাবেন, যা তাদের ওপর চাপানো ছিল’ (সুরা আরাফ ১৫৭)।
মাদক নির্মূলে যথার্থ ধারাবাহিকতা
মাদক নিষিদ্ধকরণ ও নির্মূলের লক্ষ্যে কোরআনুল কারিমের আয়াতগুলো নাজিল হয়েছে অপূর্ব ধারাবাহিকতার সঙ্গে। ধীরে ধীরে মানুষকে প্রস্তুত করা হয়েছে। ধাপগুলো গভীরভাবে লক্ষ্য করুন।
প্রথম ধাপ : প্রথমে মদের প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে নিচের আয়াতটি প্রথম নাজিল করা হয়। আল্লাহতাআলা বলেন, ‘এবং খেজুরের ফল ও আঙুর থেকেও (আমি তোমাদের পানীয় দান করি), যা দ্বারা তোমরা মদ বানাও এবং উত্তম খাদ্যও (বানাও)। নিশ্চয় এর ভিতরও সেসব লোকের জন্য নিদর্শন আছে, যারা বুদ্ধিকে কাজে লাগায়’ (সুরা নাহল : ৬৭)।
এখানে আল্লাহ অন্যান্য খাদ্যকে ‘উত্তম’ বলে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু মদের ক্ষেত্রে ‘উত্তম’ শব্দ ব্যবহার করেননি। এর দ্বারা মূলত মদ পরে কোনো সময় হারাম হওয়ায় প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে। এরপর তিনি মানুষের দৃষ্টি ফিরিয়েছেন মদের ক্ষতিকর প্রভাবগুলোর দিকে বলেছেন। যদিও তাতে কিছু উপকার রয়েছে, কিন্তু উপকারের চেয়ে ক্ষতিই বেশি। যেমন আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তারা আপনাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। আপনি বলে দিন, এ দুটির মধ্যে মহাপাপও রয়েছে এবং মানুষের জন্য কিছু উপকারও আছে। আর এ দুটির পাপ তার উপকার অপেক্ষা গুরুতর’ (সুরা বাকারা ২১৯)।
দ্বিতীয় ধাপ : দ্বিতীয় ধাপে আল্লাহতাআলা নামাজের পর্বে মদ্যপান করা নিষেধ করেন। অর্থাৎ নামাজে আসার মুহূর্তে অবশ্যই তাদের পূর্ণ সচেতন ও জাগ্রত থাকতে হবে, মাতাল থাকা যাবে না। এ কারণে আল্লাহতাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ, যখন তোমরা নেশাগ্রস্ত থাকো, তখন নামাজের কাছেও যেয়ো না, যতক্ষণ না তোমরা যা বলো তা বুঝতে পারো’ [সুরা নিসা : ৪৩)।
তৃতীয় ও চূড়ান্ত ধাপ : এভাবে একের পর এক সচেতনতার কারণে মানুষের অন্তর মদ হারাম হয়ে যাওয়ার ব্যাপারে অনেকটা প্রস্তুত হয়ে গেল এবং একদিন তা পরিপূর্ণরূপে হারাম হয়ে যাবে বলে মনে মনে দিন গুনতে লাগল। যেমন হজরত উমর রা. বলেন, ‘হে আল্লাহ, আপনি আমাদের জন্য মদের ব্যাপারে একেবারে স্পষ্ট নির্দেশনা প্রদান করুন।’ এরূপ প্রস্তুত হয়ে ওঠার পরই একদিন আল্লাহতায়ালা পরিপূর্ণভাবে মদ হারাম করে দিলেন। আল্লাহতায়ালা কোরআনে ইরশাদ করেন, ‘হে মুমিনগণ, নিশ্চয় মদ, জুয়া, প্রতিমার বেদি ও জুয়ার তির অপবিত্র, শয়তানি কাজ। সুতরাং এসব পরিহার করো, যেন তোমরা সফলতা অর্জন করো’ (সুরা মায়িদা : ৯০)।
মাদক নিষিদ্ধে ধারাক্রমের নেপথ্যে
হজরত আয়েশা রা. জাহেলি যুগের মানুষের অন্তরে মাদকাসক্তির গভীরতা সম্পর্কে খুব ভালোভাবেই জানতেন। এ কারণে তিনি মদ নিষিদ্ধ হওয়ার ক্ষেত্রে ওহির ক্রমধারাবাহিকতা সম্পর্কে বলেন, …প্রথমবারেই যদি মদ সম্পর্কে নাজিল করা হতো তোমরা মদ পান করো না, তাহলে লোকেরা অবশ্যই বলে বসত, আমরা কখনোই মদ ছাড়ব না (সহিহ বুখারি)।
শরিয়ার নির্দেশনা ও সাহাবিদের অনন্য আনুগত্য
অন্তরে আল্লাহতায়ালার ধ্যান-খেয়ালের অনুভূতি সৃষ্টির মাধ্যমে রসুল (সা.) যেভাবে সমাজকে ধীরে ধীরে তৈরি করেছিলেন, তাতে কোরআনের আয়াতে মদ হারামের কথা নাজিল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাহাবিগণ তাঁর আদেশকে মান্য করে নিয়ে ছিলেন। যেমন হজরত আনাস (রা.) বলেন, একদিন আমি আবু তালহার বাড়িতে লোকজনকে মদ পান করাচ্ছিলাম। সেদিন তারা ‘ফাজিখ’ নামক মদ পান করছিল। এদিকে রসুল (সা.) এক ব্যক্তিকে আদেশ করলেন, যেন সে এই মর্মে ঘোষণা দেয়, ‘সাবধান! মদ এখন থেকে হারাম করে দেওয়া হয়েছে।’ এই ঘোষণা শুনে আবু তালহা আমাকে বললেন, ‘বাইরে যাও এবং ঘরের সমস্ত মদ ফেলে দাও।’ আমি বাইরে গেলাম এবং সমস্ত মদ রাস্তায় ঢেলে দিলাম। আনাস রা. বলেন, সেদিন মদিনার রাস্তাঘাটে মদের প্লাবন বয়ে গিয়েছিল (সহিহ বুখারি)।
লেখক: মুহাদ্দিস, জামিয়া গাফুরিয়া মাখযানুল উলুম টঙ্গী, গাজীপুর