আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এর মাত্র ১০ দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নির্মাতা কম্পানি বোয়িংয়ের সঙ্গে ৩৭ হাজার কোটি টাকার (৩৭০ কোটি মার্কিন ডলার) এক বিশাল চুক্তি সই করার তোড়জোড় চলছে। ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার এই দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির শেষ মুহূর্তে মোট মূল্যের ওপর ১০ শতাংশ অতিরিক্ত ছাড় আদায়ের জন্য বোয়িংয়ের সিয়াটল সদার দপ্তরে একটি জরুরি চিঠি পাঠিয়েছে বিমান। সবকিছু ঠিক থাকলে নির্বাচনের আগেই হতে পারে চুক্তি। বিমান ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
বিমান ও সরকারি উচ্চপদস্থ সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, আলোচনার গতি হঠাৎ বাড়িয়ে চলতি সপ্তাহেই আনুষ্ঠানিক চুক্তি সইয়ের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। বোয়িংয়ের চূড়ান্ত জবাব পাওয়া গেলেই বিষয়টি প্রধান উপদেষ্টার অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে। উড়োজাহাজবহর আধুনিকীকরণ জাতীয় স্বার্থে প্রয়োজনীয় হলেও ভোটের ঠিক আগে এমন তাড়াহুড়া এবং জবাবদিহির অভাব নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মো. সাফিকুর রহমান বলেন, ‘বোয়িংয়ের কাছ থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার প্রক্রিয়া অনেকটাই চূড়ান্ত বোয়িংয়ের পাঠানো চূড়ান্ত প্রস্তাব বর্তমানে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। যাচাই-বাছাই শেষে প্রস্তাবটি বোয়িংয়ের কাছে পাঠানো হবে। তাদের চূড়ান্ত সম্মতির পর ন্যাশনাল নেগোসিয়েশন কমিটির সুপারিশ সাপেক্ষে বিষয়টি বিমানের পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। বোর্ডের অনুমোদন মিললে বোয়িংয়ের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষর করা হবে।’
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর পদক্ষেপ হিসেবে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার আগেই বোয়িং থেকে বিমান কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এর অংশ হিসেবে বোয়িং থেকে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে বিষয়টি পর্যালোচনা ও যাচাই-বাছাইয়ের পর বিমান এই সিদ্ধান্তে পৌঁছে।
বর্তমানে ১৯টি উড়োজাহাজ দিয়ে ২২টি আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করছে বিমান। নতুন বছরে পূর্ব এশিয়া, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে রুট সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থাটির।
পাশাপাশি অনুমোদন মিলেছে কলম্বো, বাহরাইন ও সিডনি রুটে। করাচি ফ্লাইট শুরু হলেও উড়োজাহাজসংকটে ম্যানচেস্টার রুটে অপারেশন বন্ধ হচ্ছে। আর এ সংকট কাটাতে ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কিনবে বিমান।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের জনসংযোগ মহাব্যবস্থাপক বোসরা ইসলাম বলেন, ‘আশা করছি, যখন আমাদের নতুন এয়ারক্রাফটগুলো আসবে, তখন আমাদের রুট বাড়বে।’
শেষ মুহূর্তে ১০ শতাংশ ছাড়ের চেষ্টা : প্রস্তাবিত চুক্তিতে আটটি বোয়িং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার, দুটি ৭৮৭-৯ এবং ৪টি ৭৩৭-৮ ম্যাক্স উড়োজাহাজ কেনার কথা রয়েছে। শেষ মুহূর্তে চুক্তির মোট মূল্যের ওপর ১০ শতাংশ অতিরিক্ত ছাড় আদায়ের জন্য বোয়িংয়ের সিয়াটল সদও দপ্তরে একটি জরুরি চিঠি পাঠিয়েছে সংস্থাটি।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বোয়িং এরই মধ্যে তাদের সর্বোচ্চ ছাড় দিয়ে ফেলেছে। ফলে নতুন করে ছাড় পাওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। কেন এই শেষ মুহূর্তের চিঠি এবং ছাড় না মিললেও চুক্তি হবে কি না তা নিয়ে ধোঁয়াশা কাটছে না।
তড়িঘড়ি কেন, প্রশ্ন বিশেষজ্ঞদের : মাসের পর মাস ধরে ধাপে ধাপে আলোচনা চললেও নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পর হঠাৎ আলোচনার গতি কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিমানের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলেন, ‘আগে পরিকল্পনা ছিল দাম, পাইলট প্রশিক্ষণ ও ডেলিভারির সময় নিয়ে ধীরে এগোনোর। কিন্তু নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় এখন প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে যেভাবেই হোক দ্রুত চুক্তি সই করা।’
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০২৪ সালের ডলার মূল্যের ভিত্তিতে এই দাম নির্ধারিত হলেও উড়োজাহাজগুলো সরবরাহ শুরু হবে ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে। অর্থাৎ বর্তমান সরকারের সময়ে এর কোনো সুফল পাওয়া যাবে না। বিপরীতে, সরবরাহের সময়ের মূল্যস্ফীতি ও ডলারের বিনিময়হার অনুযায়ী অর্থ পরিশোধ করতে গিয়ে বিমান বড় ধরনের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
বিমানের বোর্ড পুনর্গঠন : চুক্তির ঠিক আগে বিমানের পরিচালনা পর্ষদ (বোর্ড) পুনর্গঠন হয়েছে। সম্প্রতি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব এবং নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদকে বোর্ডে যুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীনকে বোর্ড চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
সংকট কাটবে না এখনই : ৩৭ হাজার কোটি টাকার এই চুক্তি সই হলেও বিমানের বর্তমান সক্ষমতা সংকট কাটবে না। ২০৩৫ সালে উড়োজাহাজ আসা শুরু হওয়া পর্যন্ত আগামী এক দশক বিমানকে খুঁড়িয়ে চলতে হবে। এই মধ্যবর্তী সময়ে বোয়িংয়ের কাছে চারটি উড়োজাহাজ লিজ (ইজারা) দেওয়ার অনুরোধ জানালেও বোয়িং এখন পর্যন্ত কেবল মৌখিক আশ্বাস দিয়েছে, কোনো লিখিত প্রতিশ্রুতি দেয়নি। এর আগে গত ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত বিমানের পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়।
এদিকে ইউরোপের উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসও তাদের তৎপরতা বাড়ায়। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতরা কূটনৈতিকভাবে এয়ারবাসের উড়োজাহাজ বিক্রির পক্ষে তৎপরতা চালালেও শেষ পর্যন্ত বোয়িংই চূড়ান্তভাবে এগিয়ে থাকে।
২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকা সফরে এসে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, বাংলাদেশ ফ্রান্সের কম্পানি এয়ারবাস থেকে ১০টি বড় উড়োজাহাজ ‘কেনার প্রতিশ্রুতি’ দিয়েছে।
গত নভেম্বরের শুরুতে ফ্রান্স দূতাবাসে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতরা একযোগে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন, উড়োজাহাজ কেনার আলোচনায় যেন এয়ারবাসকে ‘যৌক্তিকভাবে’ বিবেচনা করা হয়।
এয়ারবাসের প্রস্তাব সম্পর্কে জানতে চাইলে বিমানের এমডি মো. সাফিকুর রহমান বলেন, ‘এয়ারবাস যে প্রস্তাব দিয়েছিল, তার তুলনায় বোয়িংয়ের প্রস্তাবকে বিমানের কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি বিমানের জন্য বেশি উপযোগী বলে বিবেচনা করেছে। সে কারণেই ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।’
বিমানের সাবেক পরিচালনা পর্ষদ সদস্য ও এভিয়েশন বিশ্লেষক কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, ‘বোয়িংয়ের সঙ্গে চুক্তিটি যত তাড়াতাড়ি হবে ততই ভালো হবে। চুক্তিটি যাতে বিমানের জন্য লাভজনক হয় সেটা দেখতে হবে। চুক্তির পর তারা ২০৩১ সালের পর এগুলো সরবরাহ করতে পারবে বলে আমরা শুনেছি, সেটা যাতে আরো আগে করা যায় তা দেখতে হবে। তা না হলে বিমানের গন্তব্য সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হবে। তবে তড়িঘড়ি করতে গিয়ে যাতে বিমানের স্বার্থ ক্ষুণ্ন না হয় সেটা নিশ্চিত করতে হবে।’
সৌজন্যে : কালের কণ্ঠ