মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬, ০৩:৩৫ অপরাহ্ন
সর্বশেষ
নোটিশ:
তথ্য ও প্রচার মন্ত্রণালয় নিবন্ধনকৃত অনলাইন নিউজ পোর্টাল দ্য পিপলস্ নিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকে সারা দেশে জেলা প্রতিনিধি নিয়োগ করা হবে। মোবাইল: ০১৭১১-১১৬২৫৭, ০১৭১২-৪০৭২৮২ ' ই-মেইল : thepeopelesnews24@gmail.com

মাটির নিচে আল্লাহর সৃষ্টির বিস্ময়

অনলাইন ডেস্ক: / ৬ বার দেখা হয়েছে
আপডেট : মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬

কোরআনের বিভিন্ন স্থানে আল্লাহ পৃথিবীকে জীবন্ত বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন যে বৃষ্টির পানি নেমে এলে মৃত ভূমি পুনরায় জীবিত হয়ে ওঠে।

ইরশাদ হয়েছে, ‘তিনি আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন, তারপর তার দ্বারা মৃত পৃথিবীকে জীবিত করেন। নিশ্চয় এতে বুদ্ধিমানদের জন্য বহু নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা : আর-রুম, আয়াত : ২৪)

পৃথিবী কয়েকটি সমকেন্দ্রিক স্তর নিয়ে গঠিত। এর সবচেয়ে ঘন অংশ হলো অভ্যন্তরীণ কেন্দ্র (কোর), আর সবচেয়ে হালকা অংশ হলো পৃথিবীকে ঘিরে থাকা বায়ুমণ্ডল।

এসব স্তর একে অপর থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন নয়; বরং সীমানায় তারা ধীরে ধীরে একে অপরের সঙ্গে মিশে গেছে। পৃথিবীর কেন্দ্রে রয়েছে কেন্দ্রভাগ (কোর), তার ওপরে রয়েছে শিলামণ্ডল, এরপর জলমণ্ডল এবং সর্বশেষ বায়ুমণ্ডল।

শিলামণ্ডল হলো সেই কঠিন স্তর, যা মহাদেশ এবং সমুদ্র-মহাসাগরের তলদেশ গঠন করেছে। এর গড় পুরুত্ব প্রায় ৩,২০০ কিলোমিটার, যেখানে পৃথিবীর ব্যাস প্রায় ১৩,০৭০ কিলোমিটার।

এই শিলামণ্ডল আগ্নেয়, পাললিক ও রূপান্তরিত নানা ধরনের শিলা দিয়ে গঠিত। তবে এসব শিলা সাধারণত নতুন অবস্থায় থাকে না; দীর্ঘদিনের ক্ষয় ও ভাঙনের ফলে এগুলো চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে বিভিন্ন জৈব পদার্থের সঙ্গে মিশে যায়। এই সূক্ষ্ম স্তরকেই আমরা মাটি বলি। এর নিচে থাকে উপমাটি (Subsoil), যা অপেক্ষাকৃত কম ভাঙা এবং এতে জৈব পদার্থের পরিমাণও কম। মাটি ও উপমাটি মিলে পৃথিবীর শিলাস্তরের ওপর একটি আবরণ সৃষ্টি করে।

এখন আমরা এই পাতলা মাটির স্তরের কিছু বিস্ময়কর দিক নিয়ে আলোচনা করব।

মাটি কৃষি উৎপাদনের মূল ভিত্তি। এটি সেই আশ্রয়, যেখানে বীজ অঙ্কুরিত হয়, প্রয়োজনীয় খাদ্য ও পানি পায় এবং অনুকূল পরিবেশে বেড়ে ওঠে প্রচুর ফসল দেয়। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, মাটি শুধু খনিজ পদার্থ, জৈব পদার্থ, পানি ও কিছু গ্যাসের মিশ্রণ। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি তার চেয়ে অনেক গভীর।

মাটি হলো অসংখ্য জীবের আবাসস্থল। এর ভেতরে প্রতিনিয়ত লাখ লাখ জৈব ও রাসায়নিক প্রক্রিয়া সংঘটিত হয়, যা প্রকৃতির জীবনচক্রকে সচল রাখে। একটি ছোট্ট জমিতেই উদ্ভিদের শিকড়, ছোট-বড় প্রাণী, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, শৈবাল, প্রোটোজোয়া এবং অগণিত অণুজীব একসঙ্গে বসবাস করে। এদের সম্মিলিত ওজন কখনো কখনো কৃষিজ মাটির মোট ওজনের প্রায় এক-দশমাংশ পর্যন্ত হতে পারে। তাই মাটিকে যথার্থই ‘জীবন্ত মাটি’ বলা হয়।

এই জীবসমাজের বেঁচে থাকার জন্য পানির প্রয়োজন অপরিহার্য। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি পানি থেকে প্রত্যেক জীবন্ত বস্তুকে সৃষ্টি করেছি। তবু কি তারা ঈমান আনবে না?’ (সুরা : আল-আম্বিয়া, আয়াত : ৩০)

মাটির ভেতরে বসবাসকারী জীবদের মধ্যে নানা ধরনের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এসব সম্পর্কও পরিবর্তিত হয়। এই ভারসাম্যকেই বলা হয় জীববৈজ্ঞানিক ভারসাম্য।

কখনো দুটি জীব এমনভাবে পাশাপাশি বাস করে যে কেউ কারো উপকার বা অপকার করে না—এটি নিরপেক্ষ সম্পর্ক। কখনো একটি জীব অন্যটির খাদ্য প্রস্তুত করে দেয় অথবা বিষাক্ত পদার্থ ভেঙে তাকে সাহায্য করে—এটি সহযোগিতামূলক সম্পর্ক। আবার কখনো দুটি জীব পরস্পরের উপকার করে এবং একে অপরের বৃদ্ধি নিশ্চিত করে—এটি পারস্পরিক সহাবস্থান বা সহমর্মিতা।

অন্যদিকে প্রতিযোগিতা, বৈরিতা ও পরজীবিতাও দেখা যায়। কখনো জীবেরা খাদ্য, স্থান বা অক্সিজেনের জন্য প্রতিযোগিতা করে। কখনো কোনো জীব এমন রাসায়নিক পদার্থ নিঃসরণ করে, যা অন্য জীবের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত করে, অথচ নিজের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে। আবার কোনো কোনো জীব সরাসরি অন্য জীবকে আক্রমণ করে খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করে।

বাস্তবে এসব সম্পর্ক এতটাই জটিল ও পরস্পরনির্ভর যে সব মিলিয়ে এগুলো প্রকৃতির জীবনচক্রকে সচল রাখে। মোটের ওপর এগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়—১. সহযোগিতামূলক সম্পর্ক, যার মধ্যে নিরপেক্ষতা, সহযোগিতা ও পারস্পরিক সহাবস্থান অন্তর্ভুক্ত।

২. বিরোধমূলক সম্পর্ক—যার মধ্যে প্রতিযোগিতা, বৈরিতা ও পরজীবিতা অন্তর্ভুক্ত।

অনেক সময় মাটির জীবেরা শান্তিপূর্ণভাবে পাশাপাশি বসবাস করে। প্রত্যেকে নিজের নির্ধারিত কাজ সম্পন্ন করে এবং কারো প্রয়োজন অন্যের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায় না।

মাটির অণুজীবদের মধ্যে সহযোগিতার বহু উদাহরণ রয়েছে। কিছু জীব অক্সিজেন ছাড়া বাঁচতে পারে না (বায়বীয়), আবার কিছু জীবের জন্য অক্সিজেনই বিষ (অবায়বীয়)। বায়বীয় জীব অক্সিজেন ব্যবহার করে পরিবেশ থেকে তা কমিয়ে দেয়। ফলে অবায়বীয় জীব সহজে বেঁচে থাকতে পারে। এখানে অবায়বীয় জীব উপকৃত হলেও বায়বীয় জীব সরাসরি কোনো লাভ পায় না।

কিছু অণুজীব জটিল জৈব পদার্থ ভেঙে সহজ যৌগে পরিণত করে, যা অন্য জীব খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। আবার কিছু জীব বিষাক্ত পদার্থ ভেঙে মাটিকে অন্য জীবের জন্য নিরাপদ করে তোলে।

উদ্ভিদের শিকড়ের চারপাশের অঞ্চল, যাকে রাইজোস্ফিয়ার (Rhizosphere) বলা হয়, সেখানে উদ্ভিদ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান নিঃসরণ করে। এর ফলে ওই অঞ্চলে অণুজীবের সংখ্যা আশপাশের অন্যান্য অংশের তুলনায় অনেক বেশি হয়।

কখনো এই সহযোগিতা এতটাই গভীর হয় যে এক জীব অন্যটিকে ছাড়া বাঁচতেই পারে না। যেমন—কিছু সবুজ শৈবাল আলোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে কার্বোহাইড্রেট তৈরি করে Azotobacter ব্যাকটেরিয়াকে দেয়, আর ব্যাকটেরিয়া বাতাসের নাইট্রোজেন স্থির করে শৈবালকে নাইট্রোজেন সরবরাহ করে।

ডালজাতীয় উদ্ভিদ ও Rhizobium ব্যাকটেরিয়ার সম্পর্কও এর চমৎকার উদাহরণ। ব্যাকটেরিয়া উদ্ভিদের শিকড়ে গুটি (Nodule) তৈরি করে এবং বাতাসের নাইট্রোজেন স্থির করে উদ্ভিদকে দেয়। বিনিময়ে উদ্ভিদ তাকে কার্বোহাইড্রেট সরবরাহ করে। এই পারস্পরিক সম্পর্ক ছাড়া এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয় না।

কিছু ছত্রাক উদ্ভিদের শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মাইকোরাইজা (Mycorrhiza) গঠন করে। এগুলো উদ্ভিদকে মাটি থেকে পানি ও পুষ্টি উপাদান শোষণে সাহায্য করে। আবার অনেক সময় দুই ধরনের জীব একসঙ্গে এমন জটিল পদার্থ ভেঙে ফেলে, যা তাদের কেউ একা করতে পারে না।

অন্যদিকে মাটিতে বিরোধও বিদ্যমান। জীবেরা স্থান, খাদ্য ও অক্সিজেনের জন্য প্রতিযোগিতা করে। অনেক সময় একটি জীব মাটির অম্লতা বা অক্সিজেনের পরিমাণ পরিবর্তন করে নিজের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে এবং প্রতিদ্বন্দ্বীর বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত করে।

অনেক জীব অন্য জীবকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে। যেমন—প্রোটোজোয়া ব্যাকটেরিয়া খায়, অনেক পোকামাকড় ছত্রাক খায়, কিছু ছত্রাক নেমাটোড কৃমিকে হত্যা করে এবং কিছু ভাইরাস ব্যাকটেরিয়া, উদ্ভিদ ও প্রাণীর কোষ ধ্বংস করে।

বিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর একটি হলো বিষাক্ত পদার্থ নিঃসরণ। অনেক অণুজীব এমন রাসায়নিক পদার্থ বা অ্যান্টিবায়োটিক তৈরি করে, যা প্রতিদ্বন্দ্বী জীবকে মেরে ফেলে বা তাদের বৃদ্ধি থামিয়ে দেয়। কখনো কখনো কোনো জীব নিজেরই বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণকারী পদার্থও উৎপন্ন করে।

এই সহযোগিতা ও বিরোধ—উভয় দিক থেকেই গভীরভাবে লক্ষ করলে স্পষ্ট হয় যে মহান আল্লাহ প্রতিটি জীবকে একটি নির্দিষ্ট দায়িত্ব দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। সেই দায়িত্ব পালনের জন্য তিনি প্রত্যেককে উপযুক্ত ক্ষমতা ও উপায়ও দিয়েছেন। এসব জটিল সম্পর্কের সমন্বয়েই প্রকৃতির জীবনচক্র নিরবচ্ছিন্নভাবে চলতে থাকে—না কোনো ঘাটতি, না কোনো অতিরিক্ততা। এ কারণেই মহান আল্লাহ সত্য বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আমি প্রত্যেক বস্তু একটি নির্ধারিত পরিমাপ অনুযায়ী সৃষ্টি করেছি।’

(সুরা : আল-কামার, আয়াত : ৪৯)


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর