ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়িয়েছে আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থা মুডিস রেটিংস। সংস্থাটি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ভারতের প্রকৃত মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭ শতাংশ করেছে।
পশ্চিম এশিয়ার চলমান সংঘাতের প্রভাব ভারতের অর্থনীতিতে আগের আশঙ্কার তুলনায় কম হওয়া এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও বিনিয়োগ শক্তিশালী থাকায় এই পূর্বাভাস বাড়ানো হয়েছে।
মুডিস বলেছে, শক্তিশালী বেসরকারি ভোগব্যয়, বিনিয়োগের গতি, অব্যাহত সরকারি অবকাঠামো ব্যয় এবং পরিষেবা খাতের ভালো কার্যক্রম ভারতের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিচ্ছে। চলতি অর্থবছরে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগও আরও বাড়বে বলে আশা করছে সংস্থাটি, যা প্রবৃদ্ধিতে অতিরিক্ত গতি যোগ করতে পারে।
মুডিসের মতে, ভারত জি-২০-এর অন্য সব অর্থনীতি এবং একই ঋণমানের উদীয়মান বাজারগুলোর তুলনায় দ্রুত প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রাখবে। তবে অর্থনীতির সামনে কিছু ঝুঁকি রয়েছে বলেও সতর্ক করেছে সংস্থাটি।
প্রত্যাশার চেয়ে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি
অর্থনীতির সাম্প্রতিক তথ্য প্রত্যাশার চেয়ে ভালো হওয়াই মুডিসের পূর্বাভাস বাড়ানোর অন্যতম কারণ। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে ভারতের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। এ সময়ে বিনিয়োগ ও উৎপাদন খাতের কার্যক্রম প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে খনিশিল্প এবং ভোক্তামুখী কয়েকটি পরিষেবা খাত তুলনামূলক দুর্বল ছিল।
সর্বশেষ সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারতের অর্থনীতি ৭ দশমিক ৭ শতাংশ হারে বেড়েছে। ওই অর্থবছরে বেসরকারি চূড়ান্ত ভোগব্যয় এবং মোট স্থায়ী মূলধন গঠন—উভয়ই ৭ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
মুডিস বলেছে, শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের অভিঘাত সামলাতে ভারতকে সহায়তা করছে। ওই সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বেড়েছে এবং মূল্যস্ফীতি ও বৈশ্বিক বাণিজ্য নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ভোগ ও বিনিয়োগে ভর করে প্রবৃদ্ধি
ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বেসরকারি ভোগব্যয়ের ভূমিকা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। মুডিসের মতে, দেশটিতে পারিবারিক চাহিদা শক্তিশালী হয়েছে এবং মোট স্থায়ী মূলধন গঠনও দৃঢ় রয়েছে। পাশাপাশি সরকারি অবকাঠামো বিনিয়োগ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করছে।
সংস্থাটি আশা করছে, বেসরকারি বিনিয়োগও সামনে আরও জোরালো হবে। পরিষেবা খাতের শক্তিশালী কার্যক্রমও প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করছে। এসব অভ্যন্তরীণ শক্তি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিবেশের নেতিবাচক প্রভাবের একটি অংশ পুষিয়ে দিচ্ছে।
আইএমএফ, আরবিআই ও এসঅ্যান্ডপির চেয়ে বেশি পূর্বাভাস
মুডিসের নতুন ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস অন্যান্য প্রধান আন্তর্জাতিক ও দেশীয় প্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিক পূর্বাভাসের চেয়ে বেশি।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) জুলাই ২০২৬-এর পূর্বাভাসে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ভারতের প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৪ শতাংশ হবে বলে জানিয়েছে। সংস্থাটির মতে, জ্বালানির উচ্চ মূল্য ভারতের প্রবৃদ্ধির ওপর চাপ তৈরি করছে। তবে বেসরকারি ভোগব্যয় ও পরিষেবা খাতের শক্তিশালী কার্যক্রম অর্থনীতিকে সহায়তা করছে।
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল রেটিংস ভারতের প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৬ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। তাদের মতে, পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে, জ্বালানির দাম বাড়লে এবং সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে ভারতের প্রবৃদ্ধির গতি কমতে পারে।
ভারতের রিজার্ভ ব্যাংকও (আরবিআই) ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬ দশমিক ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে।
জ্বালানি ও এল নিনোর ঝুঁকি
প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়ালেও ভারতের অর্থনীতির ঝুঁকি পুরোপুরি কেটে যায়নি বলে জানিয়েছে মুডিস। বিশেষ করে জ্বালানির উচ্চ মূল্য মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে ভোগব্যয় ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ভারত অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দীর্ঘ সময় তেলের দাম বেশি থাকলে তা পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে।
এছাড়া এল নিনোর প্রভাবে খাদ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কার কথাও জানিয়েছে মুডিস। জ্বালানি ও খাদ্যের দাম একসঙ্গে বাড়লে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যেতে পারে, যার প্রভাব পড়বে ভোক্তা চাহিদায়।
রাজস্ব ঘাটতি কমানোর গতি ধীর হতে পারে
পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের প্রভাব মোকাবিলায় ভারতের রাজস্বনীতিতে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়নি বলে জানিয়েছে মুডিস। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম দীর্ঘ সময় উচ্চ থাকলে সরকারি ভর্তুকির ব্যয় বাড়তে পারে এবং অতিরিক্ত সরকারি সহায়তার প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।
এর পাশাপাশি প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি এবং অবকাঠামো খাতে অব্যাহত সরকারি বিনিয়োগ রাজস্ব ঘাটতি কমানোর প্রক্রিয়াকে ধীর করতে পারে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের কেন্দ্রীয় বাজেটে ভারতের রাজস্ব ঘাটতি জিডিপির ৪ দশমিক ৩ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ ঘাটতি ছিল ৪ দশমিক ৪ শতাংশ।
মুডিসের ধারণা, ভারতের সরকারি ঋণের বোঝা ধীরে ধীরে কমবে। তবে একই ঋণমানের অন্যান্য দেশের তুলনায় ভারতের ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা দুর্বল বলেও উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।
ভারতের ঋণমান অপরিবর্তিত
প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়ালেও ভারতের সার্বভৌম ঋণমান পরিবর্তন করেনি মুডিস। দেশটির বিএএ৩ ঋণমান বহাল রাখা হয়েছে এবং এর পূর্বাভাস বা ‘আউটলুক’ রাখা হয়েছে স্থিতিশীল।
মুডিসের মতে, ভারতের বড় ও বহুমুখী অর্থনীতি, উচ্চ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা, বৈদেশিক খাতের অবস্থান এবং অভ্যন্তরীণ অর্থায়নের স্থিতিশীল ভিত্তি দেশটির ঋণমানকে সমর্থন করছে। তবে এর বিপরীতে রয়েছে সরকারের উচ্চ ঋণের বোঝা, তুলনামূলক দুর্বল ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা এবং কম মাথাপিছু আয়।
ফলে ভারতের অর্থনীতি অভ্যন্তরীণ চাহিদা, বিনিয়োগ ও পরিষেবা খাতের ওপর ভর করে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি ধরে রাখলেও জ্বালানির দাম, খাদ্য মূল্যস্ফীতি, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনা আগামী দিনে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে। সূত্র: ফার্স্টপোস্ট