রমাদানের শেষ দশক আমাদের দোরগোড়ায় উপস্থিত। প্রিয় নবী (সা.) এই দশকে জীবনের সবচেয়ে বেশি ইবাদতে মগ্ন হতেন। এই দশকের শ্রেষ্ঠ ইবাদত হলো ইতিকাফ। এটি আল্লাহমুখী জীবনের অনন্য প্রশিক্ষণ। বর্তমান যুগে আমরা নানাবিধ তথ্যপ্রযুক্তি এবং প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় অগণিত যোগাযোগ, সংযোগ ও কর্মকাণ্ডে নিজেদের এমনভাবে জড়িয়ে ফেলেছি যে আমাদের মনোযোগ চরমভাবে বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছে। ফলে দুই রাকাত সালাতও পূর্ণ মনোযোগের সঙ্গে আদায় করতে পারি না। এমন বাস্তবতায় ইবাদতে একাগ্রতা ফিরিয়ে আনতে ইতিকাফের আমল অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
ইতিকাফ এসব দুনিয়াবি ব্যস্ততা ও কোলাহল থেকে মুক্ত করে একান্তভাবে মহান আল্লাহর দিকে মনোনিবেশ করার সুযোগ করে দেয়। এ ইবাদতটি মূলত নিজের গুনাহ, আখিরাত এবং মহান রবের সঙ্গে সম্পর্ক গভীরভাবে উপলব্ধির এমন সুযোগ, যা জীবনে খুব কমই আসে। সিয়াম যেমন আমাদের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখায়, ইতিকাফ তেমনি আমাদের আত্মাকে আল্লাহর ঘরে বেঁধে ফেলে আধ্যাত্মিক উন্নতির চূড়ান্ত শিখরে নিয়ে যায়। এটি রসুল (সা.)-এর এক গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত ও তাঁর জীবন্ত আদর্শ, যা রমাদানের ইবাদতকে পূর্ণতা দান করে।
পূর্ববর্তী নবীদের শরিয়তেও এর প্রচলন ছিল। মহান আল্লাহ কোরআনে বলেছেন, ‘আমি ইবরাহিম ও ইসমাঈল (আ.)-কে নির্দেশ দিয়েছিলাম তোমরা আল্লাহর ঘরকে পবিত্র রাখ তাওয়াফকারী, ইতিকাফকারী ও রুকু-সিজদাকারীদের জন্য (সুরা বাকারা)’। এই ঐশী নির্দেশ থেকে বোঝা যায়, আল্লাহর ঘরকে কেন্দ্র করে ইতিকাফের মাধ্যমে রবের নৈকট্য তালাশ করা একটি চিরন্তন পদ্ধতি।
নবীজি (সা.) মদিনায় হিজরতের পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তিনি নিয়মিত রমাদানের শেষ দশকে ইতিকাফ পালন করতেন (বুখারি)। একবার সফরের কারণে ইতিকাফ করতে না পেরে পরের বছর তিনি টানা বিশ দিন ইতিকাফ করেছিলেন (ইবনে মাজাহ)। ইতিকাফের প্রতি এই যে নবীজি (সা.)-এর গভীর অনুরাগ, এর মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি ইতিকাফ কতটা গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত!
ইতিকাফের মূল দর্শনের দিকে লক্ষ্য করলে এর মাহাত্ম্য আরও পরিষ্কারভাবে আমরা বুঝতে পারব। এটি অনেকটা দাবি আদায়ের জন্য কারও চৌকাঠে বসে যাওয়ার মতো ব্যাপার। বান্দা যখন দুনিয়ার সব কাজ ফেলে আল্লাহর ঘরের কোণে কাঁথা-বালিশ নিয়ে শুয়ে পড়ে, তার মনের আর্জি যেন এমন-হে আল্লাহ, ক্ষমা না নিয়ে আমি আর ঘরে ফিরব না। নিঃসন্দেহে এটি মহান আল্লাহর কাছে পূর্ণ আত্মসমর্পণের উৎকৃষ্ট নজির।
এ ছাড়া ইতিকাফের উপকারিতাও বহুমুখী। মসজিদে অবস্থানের প্রতিটি মুহূর্ত ইবাদত হিসেবে গণ্য হয়। একজন ইতিকাফকারী যখন ঘুমিয়ে থাকেন বা চুপচাপ বসে থাকেন, তখনো তিনি ইবাদতের সওয়াব পেতে থাকেন। বিশেষ করে লাইলাতুল কদর তালাশ করার জন্য ইতিকাফের বিকল্প নেই। ১০ দিন দুনিয়াবি কাজ থেকে মুক্ত থেকে ইবাদতে মগ্ন থাকার ফলে মানুষের চরিত্র ও আমলে উত্তম পরিবর্তন সাধিত হয়। নফসের পরিশুদ্ধি ঘটে এবং অন্তরে প্রশান্তি নেমে আসে। যান্ত্রিক জীবনের নিরন্তর ছুটে চলায় আমরা নিজের সঙ্গে কথা বলার সময় পাই না; ইতিকাফ আমাদের সেই সুযোগটি দেয়, যাতে আমরা নিজের ভুলগুলো চিহ্নিত করতে পারি এবং আখিরাতের পাথেয় সংগ্রহের পরিকল্পনা করতে পারি।
তবে ইতিকাফের এই অমূল্য সময়কে সার্থক করতে হলে এর প্রকৃত দাবি উপলব্ধি করা প্রয়োজন। আমাদের সমাজে অনেকে ইতিকাফে বসেও সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যস্ত থাকেন বা অনর্থক গল্পগুজবে লিপ্ত হন। ইতিকাফের প্রাণ হলো জিকির, তিলাওয়াত, নফল সালাত ও তওবা-ইস্তিগফার। অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা থেকে দূরে থেকে একাগ্রচিত্তে আল্লাহর স্মরণে মশগুল থাকলেই কেবল এর রুহানি ফায়দা অর্জন সম্ভব।
দুঃখজনক হলেও সত্য, নবীজি (সা.)-এর জীবনে সবচেয়ে গুরুত্ব পাওয়া এই আমলটি আজ আমাদের সমাজে সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। যে আমলটি রসুলুল্লাহ (সা.) জীবনে কখনো ছাড়েননি, আমরা অনেকেই সেই আমলটি জীবনে একবারও পালন করি না। এর চেয়ে দুর্ভাগ্যের আর কী হতে পারে! ব্যক্তি ও সমাজজীবনে এই পবিত্র সুন্নাহকে পুনর্জীবিত করা আমাদের সবার ইমানি দায়িত্ব। প্রত্যেক মুমিনের উচিত এই আমলের প্রতি যত্নবান হওয়া এবং নিজের জীবনে অন্তত একবার হলেও এই মহান ইবাদতের স্বাদ গ্রহণের চেষ্টা করা। আসুন, আমরা অন্তত এই রমাদানের শেষ দশকে ইতিকাফের জন্য খাঁটি নিয়ত ও পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করি। গুরুত্বপূর্ণ এই ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করি।
জুমার মিম্বর থেকে
গ্রন্থনা : নুরুল ইসলাম তানঈম