লিবিয়ার সবচেয়ে বড় সচল তেল শোধনাগার জাওয়িয়া অয়েল রিফাইনিং কোম্পানিতে ড্রোন হামলায় ভয়াবহ আগুন লেগেছে। শোধনাগারটির একটি পেট্রোলভর্তি ট্যাংকে হামলার পর আগুন ছড়িয়ে পড়ে। বিশাল এই আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে দমকলকর্মীরা কাজ করছেন। শোধনাগারটি রাজধানী ত্রিপোলি থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত।
লিবিয়ার ন্যাশনাল অয়েল কর্পোরেশন (এনওসি) সোমবার সন্ধ্যায় দেওয়া এক বিবৃতিতে জানায়, শোধনাগারের ৪০২ নম্বর ট্যাংকে আগুনের সূত্রপাত হয়। ট্যাংকটি ব্রেগা অয়েল কোম্পানির মালিকানাধীন।
এনওসি জানায়, ওই ট্যাংকে প্রায় ৪৫ লাখ লিটার বা ১২ লাখ গ্যালন পেট্রোল ছিল। ট্যাংকটিকে সরাসরি লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালানো হয়। এতে ভয়াবহ আগুনের সূত্রপাত হয় এবং একপর্যায়ে ট্যাংকটি পুরোপুরি ধসে পড়ে।
দেশটির জাতীয় তেল কোম্পানি সতর্ক করে জানিয়েছে, হামলা অব্যাহত থাকলে তারা ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করে শোধনাগারের কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হতে পারে।
লিবিয়ার অ্যাম্বুলেন্স ও জরুরি সেবা মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, আগুনের ঘটনায় গুরুতর আহত হওয়ার কোনো খবর পাওয়া যায়নি। বেশিরভাগ রোগীকে ধোঁয়া শ্বাস নেওয়ার কারণে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
আল জাজিরার যাচাই করা ভিডিওতে শোধনাগারটির ওপর বিশাল আগুনের শিখা এবং ঘন কালো ধোঁয়া দেখা গেছে। জাওয়িয়া শোধনাগারটি লিবিয়ার সবচেয়ে বড় চালু তেল শোধনাগার। এর দৈনিক পরিশোধন ক্ষমতা ১ লাখ ২০ হাজার ব্যারেল।
এনওসি আরও জানিয়েছে, এর আগে রোববার শোধনাগারের একটি পানি লবণমুক্তকরণ প্ল্যান্ট এবং শনিবার একটি ন্যাফথা সংরক্ষণাগারেও ড্রোন হামলা হয়েছিল।
হামলার পর কোম্পানিটি ওই এলাকায় ‘সর্বোচ্চ জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করেছে। একই সঙ্গে কর্তৃপক্ষকে ঘটনার তদন্ত করে হামলাকারীদের বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছে।
তবে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো গোষ্ঠী হামলার দায় স্বীকার করেনি। হামলার পেছনে কারা রয়েছে, সে বিষয়ে এনওসিও কোনো মন্তব্য করেনি।
কয়েক ঘণ্টা পর দেওয়া আরেক বিবৃতিতে এনওসি জানায়, জাওয়িয়া শোধনাগার এখনও ‘নাশকতামূলক হামলার শিকার হচ্ছে’। একটি ড্রোন জাওয়িয়া অয়েল রিফাইনিং কোম্পানির পরিচালিত তেল মিশ্রণ ও বোতলজাতকরণ/ভরাট প্ল্যান্টকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়।
কোম্পানির ভাষ্য অনুযায়ী, ড্রোনটি ওই প্ল্যান্টের প্রধান তেল ট্যাংক এবং অভ্যন্তরীণ বাজারের জন্য তেল উৎপাদনে ব্যবহৃত পাইপলাইন নেটওয়ার্কের কাছে গিয়ে পড়ে। তবে এ ঘটনায় কোনো হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
এনওসি আবারও সতর্ক করে বলেছে, ‘এই হামলা অব্যাহত থাকলে কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদকে ফোর্স মেজর ঘোষণা করে শোধনাগারের কার্যক্রম স্থগিত করতে হবে।’
এদিকে ব্রেগা অয়েল কোম্পানি সব পক্ষকে সংঘাত বন্ধ করার পাশাপাশি তেল স্থাপনা ও ডিপোগুলো থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানিয়েছে।
কোম্পানিটি বলেছে, তেল স্থাপনাগুলো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এবং এগুলো সব লিবীয় নাগরিকের সম্পদ। এসব স্থাপনা রক্ষা করা জাতীয় দায়িত্ব এবং এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অবহেলা গ্রহণযোগ্য নয়।
জাওয়িয়া শোধনাগারে ধারাবাহিক এই হামলা লিবিয়ার দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা সংকটকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। ২০২০ সালের যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে বড় ধরনের সংঘাত বন্ধ হলেও দেশটির বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রশাসন ও সশস্ত্র গোষ্ঠী এখনও নিজেদের প্রভাব ধরে রেখেছে।
২০১১ সালে দীর্ঘদিনের নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে ক্ষমতাচ্যুত করা ন্যাটো-সমর্থিত বিদ্রোহের পর ২০১৪ সালে লিবিয়া কার্যত বিভক্ত হয়ে পড়ে।
বর্তমানে দেশটিতে ক্ষমতা নিয়ে দুটি সরকার পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। এর একটি হলো জাতিসংঘ-স্বীকৃত ত্রিপোলিভিত্তিক সরকার, যার নেতৃত্বে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী আবদুল হামিদ দবেইবা। অন্যদিকে দেশটির পূর্বাঞ্চলে সামরিক কমান্ডার খলিফা হাফতার-সমর্থিত একটি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রশাসন রয়েছে।
লিবিয়া সরকার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী দবেইবা দিনের শুরুতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, রাজধানীর কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রধানসহ গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে দেশের সর্বশেষ নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করা হয়।
সরকারের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করে কিংবা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও অবকাঠামোর ক্ষতি করে এমন যেকোনো লঙ্ঘন বা কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন দবেইবা।
অন্যদিকে, লিবিয়ার পার্লামেন্টের একটি কমিটি জাওয়িয়া শোধনাগারে হামলার নিন্দা জানিয়ে দেশটির তেল স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা আরও জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছে।
পার্লামেন্টের হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের জ্বালানি ও প্রাকৃতিক সম্পদবিষয়ক কমিটি এক বিবৃতিতে বলেছে, লিবিয়ার তেল ও গ্যাস খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এবং জাতীয় অর্থনীতির ভিত্তি জাওয়িয়া শোধনাগারে সংঘটিত এই হামলার তারা তীব্র নিন্দা জানায়।