রাশিয়ার সামরিক বাহিনীকে অস্ত্র ও প্রযুক্তি সরবরাহ এবং মস্কোর পক্ষে গোয়েন্দাবৃত্তি চালানোর অভিযোগে পোল্যান্ডে ছয়জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধে কিয়েভের অন্যতম প্রধান সমর্থক পোল্যান্ড বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিকভাবে এই গ্রেফতারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে পোল্যান্ডের জাতীয় প্রতিরক্ষা ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পণ্য ও প্রযুক্তির আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংক্রান্ত আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
পোল্যান্ডের স্পেশাল সার্ভিসেসের সমন্বয়কারী তোমাশ শিমোনিয়াক তাঁর এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টে নিশ্চিত করেছেন যে, ধৃতদের মধ্যে ২৫ থেকে ৫২ বছর বয়সী পাঁচজন পোলিশ নাগরিক এবং একজন ৩৭ বছর বয়সী রুশ নাগরিক রয়েছেন। পোল্যান্ডের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা (এবিডব্লিউ) জানিয়েছে, রাশিয়ার নাগরিকসহ চার আসামির বিরুদ্ধে সরাসরি গোয়েন্দাবৃত্তির অভিযোগ গঠন করা হয়েছে এবং তাদের তিন মাসের প্রাক-বিচারিক আটকে রাখা হয়েছে। সংস্থাটির মতে, অভিযুক্ত দলটি অবৈধভাবে রাশিয়াকে বিপুল পরিমাণে সামরিক কাজে ব্যবহারের উপযুক্ত সরঞ্জাম ও যন্ত্রাংশ সরবরাহ করছিল, যা প্রধানত গোলাবারুদ এবং অস্ত্র ব্যবস্থা তৈরিতে ব্যবহৃত হতো।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটোর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এবং জোটের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তে অবস্থিত পোল্যান্ড ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণ শুরুর পর থেকেই মস্কোর বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ‘নাশকতার’ অভিযোগ তুলে আসছে। দেশটির ভূখণ্ডটি ইউক্রেনে পশ্চিমা দেশগুলোর সামরিক ও মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর মূল ট্রানজিট রুট হিসেবে কাজ করে। সম্প্রতি পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড তুস্ক জানিয়েছেন, রাশিয়া সংলগ্ন কালিনিনগ্রাদ সীমান্তে এক রাতে একটি সম্ভাব্য উস্কানিমূলক উদ্যোগ ব্যর্থ করে দিয়েছে পোলিশ নিরাপত্তা বাহিনী।
তদন্তকারীদের তথ্যানুযায়ী, এই আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্রটি ২০২৩ সালের জুন থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সক্রিয় ছিল। চক্রটির কার্যক্রম বিস্তৃত ছিল পোল্যান্ড, লিথুয়ানিয়া এবং রাশিয়ার অঞ্চল জুড়ে। তারা অস্ত্র তৈরির পণ্য সামগ্রী বায়না ও ক্রয় করত, সেগুলো সংগ্রহের ব্যবস্থা করত এবং সীমান্ত পার করে রাশিয়ার কালিনিনগ্রাদ অঞ্চলে নিয়ে যেত। এই মালামাল পরিবহনের কাজে অভিযুক্তরা বিশেষ গোপন কক্ষ বা প্রকোষ্ঠ তৈরি করা যানবাহন ব্যবহার করত এবং একাধিকবার পোলিশ-রুশ সীমান্ত পারাপার করেছিল। যদিও কিছু সরঞ্জাম পোল্যান্ডের সীমান্ত রক্ষীদের হাতে ধরা পড়ে যায়।
বেআইনিভাবে পাচার করা এই সরঞ্জামগুলোর মধ্যে মূলত শেল কেসিং ও প্রজেক্টাইলসহ গোলাবারুদের বিভিন্ন খুচরা যন্ত্রাংশ অন্তর্ভুক্ত ছিল। প্রসিকিউটরের কার্যালয়ের হিসাব অনুযায়ী, রাশিয়াতে কেনা এবং পাচার করা এই সামরিক উপাদানগুলোর মোট আর্থিক মূল্য ২০ লাখ পোলিশ জ্লোটি বা প্রায় ৪ লাখ ৫৫ হাজার ৪৩০ ইউরোর বেশি।
গোয়েন্দাবৃত্তির পাশাপাশি গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে চারজনের বিরুদ্ধে পোল্যান্ড প্রজাতন্ত্রের জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়ে রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কাজ করার কঠোর অভিযোগ যুক্ত করা হয়েছে। এবিডব্লিউ এই আন্তর্জাতিক চক্রটির তৎপরতার পূর্ণাঙ্গ চিত্র ও পরিধি উদঘাটনে বিস্তৃত তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। শিমোনিয়াকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারির পর থেকে এ পর্যন্ত এবিডব্লিউ পরিচালনা করা বিভিন্ন গোয়েন্দাবৃত্তি ও নাশকতাবিরোধী তদন্তে প্রায় ১০০ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করা হয়েছে।
সূত্র: ইউরোনিউজ