শীতের প্রকোপে কাঁপছে দেশ। এই শীতে সচ্ছলদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব শীতবস্ত্র ও অন্যান্য সহযোগিতা নিয়ে অসহায় শীতার্ত জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়ানো। থার্টি ফার্স্ট নাইটের মতো অহেতুক উৎসবে আমরা টাকা নষ্ট করি, ফানুসের নামে টাকা পোড়াই, অথচ খেয়াল করলেই দেখতে পাব, আমাদের ঘরের পাশেই অসহায় মানুষ কম্বলের অভাবে শীতে কাঁপছে। এই মানুষগুলোর প্রতি আমাদের সহমর্মী হতে হবে। সব সময় নতুন কম্বল কিংবা শীতবস্ত্র উপহার দেওয়া জরুরি নয়। বরং ঘরে পড়ে থাকা অব্যবহৃত শীতবস্ত্রও আপনি গরিব মানুষকে দান করতে পারেন। কারণ, দুর্গত মানুষের সেবা করা ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আমল। রসুল (সা.) বলেছেন, মহান আল্লাহ দয়ালুদের ওপর দয়া করেন। তোমরা জমিনবাসীর ওপর দয়া করো, আসমানবাসী তোমাদের প্রতি দয়া করবেন (তিরমিজি)।
শীতার্ত জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়ানো ছাড়াও শীত আমাদের জন্য বিশেষ কিছু আমলের বার্তা নিয়ে আসে। তাই এই হাড়কাঁপানো শীতেও কীভাবে বেশি বেশি ইবাদত করে আমরা আল্লাহর প্রিয় হয়ে উঠতে পারি, সে বিষয়ে মনোনিবেশ করা উচিত। শীত এবং গরমের মূল উৎস সম্পর্কে রসুল (সা.)-এর হাদিস রয়েছে। বুখারি বর্ণিত হাদিসে রসুল (সা.) বলেছেন, জাহান্নাম তার প্রতিপালকের কাছে অভিযোগ করল, হে আমার প্রতিপালক, (গরমের তীব্রতায়) আমার এক অংশ আরেক অংশকে গ্রাস করে ফেলেছে। ফলে মহান আল্লাহ তাকে দুটি নিশ্বাস ফেলার অনুমতি দিলেন, একটি শীতকালে আর একটি গ্রীষ্মকালে। আর সে দুটি হলো, তোমরা গ্রীষ্মকালে যে প্রচণ্ড উত্তাপ এবং শীতকালে যে প্রচণ্ড ঠান্ডা অনুভব কর।
তার মানে জাহান্নাম যে গরম নিশ্বাস ফেলে, সেটাকে আল্লাহ গ্রীষ্ম হিসেবে বিভিন্ন এলাকায় বণ্টন করেন আবার ঠান্ডা নিশ্বাস প্রয়োজন ভেদে বিভিন্ন এলাকায় বণ্টন করেন। এই হাদিসের আলোকে শীত কিংবা গরমে আমাদের জন্য একটি শিক্ষা রয়েছে। সেটা হলো, যখন আমরা শীতের এবং গরমের তীব্রতা অনুভব করব, তখন আমাদের জাহান্নামের কথা ভাবতে হবে। এই ভাবনা আমাদের জাহান্নামের প্রতি ভয় এবং ভালো কাজে উদ্বুদ্ধ করতে সাহায্য করবে।
নফল রোজা রাখা শীতকালের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আমল। গরমে ঘাম ঝরার কারণে আমরা দুর্বল হয়ে পড়ি। আবার গরমের দিনগুলো হয় দীর্ঘ। ফলে গরমকালে রোজা রাখা কঠিন হয়। পক্ষান্তরে শীতে শরীর দুর্বল হয় কম, তদুপরি দিন ছোট হওয়ায় রোজা রাখতে তেমন কোনো কষ্টই হয় না। আবার কষ্ট কম হয় বলে আল্লাহ কিন্তু সওয়াব কম দেন না। ফলে কম কষ্টে অধিক সওয়াব লাভের অপূর্ব সুযোগ হলো শীতকালের রোজা। এই সুযোগ হেলায় হারানো বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
তাহাজ্জুদ কমবেশি সারা বছরই আদায় করা মুমিনের বৈশিষ্ট্য। বিশেষ করে শীতকালে তাহাজ্জুদ আদায়ের পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়া উচিত। কেননা শীতকালে রাত দীর্ঘ হয়। ফলে এশার পরপর ঘুমিয়ে পড়লে তাহাজ্জুদের সময় পর্যন্ত পর্যাপ্ত ঘুম হয়ে যায়। পর্যাপ্ত বিশ্রামের পর সহজেই তাহাজ্জুদ আদায় করা যায়। তাই শীতকালে শেষ রাতে উঠে তাহাজ্জুদ আদায় করে রোজার নিয়তে সাহরি খাওয়া যেতে পারে।
অজু একটি স্বতন্ত্র ইবাদত। অন্য সময়ের চেয়ে শীতকালে অজুর প্রতি যত্নবান হওয়া বেশি প্রয়োজন। কারণ, হাদিসে কষ্টের সময়ে অজু করতে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। আর শীতকালে অজু করতে কষ্ট হয়। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুল (সা.) বলেছেন, আমি কি তোমাদের এমন কাজ সম্পর্কে জানাব না, যা করলে আল্লাহ পাপরাশি দূর করে দেন এবং মর্যাদা বৃদ্ধি করেন? সাহাবিরা বললেন, বলুন, হে আল্লাহর রসুল। তিনি বললেন, কষ্টের সময় ভালোভাবে অজু করা, মসজিদে গমনের জন্য বেশি পদচারণ করা এবং এক নামাজের পর আরেক নামাজের জন্য প্রতীক্ষা করা। আর এগুলোই হলো সীমান্ত প্রহরা (মুসলিম)।
শীতকালে অনেকে জোর করে অজু ধরে রাখেন। অনেকে তো আসরের অজু দিয়ে এশার সালাতও আদায় করেন। এমনটা করা অনুচিত। এটা স্বাস্থ্যের জন্যও ক্ষতিকর, দীনি দৃষ্টিকোণেও প্রশংসনীয় নয়। যারা শীতের ভয়ে জোর করে অজু ধরে রাখেন, এর মাধ্যমে তারা কষ্টের সময়ে অজু করার বিশেষ ফজিলত থেকে বঞ্চিত হবেন।
অজুতে পা না ধুয়ে বিশেষ ধরনের মোজার ওপর মাসেহ করা শীতকালের বিশেষ আমল। সব সময় না হলেও মাঝে মাঝে এই আমল করা উচিত। কারণ এটি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের একটি অন্যতম নিদর্শন, রসুল (সা.)-এর একটি আমল এবং শীতে বান্দার প্রতি আল্লাহর দেওয়া অন্যতম একটি ছাড়।
মহান আল্লাহ আমাদের শীতার্ত জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে শীতের আমলের প্রতি যত্নবান হওয়ার তৌফিক দান করুন।
জুমার মিম্বর থেকে
গ্রন্থনা : সাব্বির জাদিদ