মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০২:০১ অপরাহ্ন
নোটিশ:
তথ্য ও প্রচার মন্ত্রণালয় নিবন্ধনকৃত অনলাইন নিউজ পোর্টাল দ্য পিপলস্ নিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকে সারা দেশে জেলা প্রতিনিধি নিয়োগ করা হবে। মোবাইল: ০১৭১১-১১৬২৫৭, ০১৭১২-৪০৭২৮২ ' ই-মেইল : thepeopelesnews24@gmail.com

বিদ্বেষহীন মন জান্নাতের পথ সুগম করে

অনলাইন ডেস্ক: / ৯ বার দেখা হয়েছে
আপডেট : মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

ঈমানের সৌন্দর্য তখনই পরিপূর্ণ হয়, যখন মানুষের হৃদয় হিংসা, বিদ্বেষ, অপবাদ ও ধোঁকামুক্ত থাকে। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর উম্মতকে নামাজ, রোজা ও অন্যান্য আমলের দিকে আহবান জানানোর পাশাপাশি অন্তরের পরিশুদ্ধতাকে ঈমানের মূল ভিত্তি হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। অন্যের প্রতি হিংসা না রাখা, কল্যাণ কামনা করা এবং স্বচ্ছ মনের অধিকারী হওয়াকে তিনি নিজের প্রিয় সুন্নাহ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। সাহাবায়ে কেরামের জীবন ও নবীজির হাদিসে বিদ্বেষমুক্ত মানসিকতার যে মর্যাদা ফুটে উঠেছে, তা জান্নাতপ্রাপ্তির পথকে সুস্পষ্টভাবে নির্দেশ করে।

বিদ্বেষমুক্ত থাকাই নবীজির প্রকৃত

সুন্নাহ : অন্যের গিবত-শেকায়াত, অপবাদ-অপমান ও হিংসা-বিদ্বেষ ত্যাগ করে স্বচ্ছ মনের অধিকারী হওয়াই নবীজির এক অনন্য মহান সুন্নাহ। এই সুন্নাহ নবীজির সঙ্গে ভালোবাসা সৃষ্টির মাধ্যমে জান্নাতের পথ সুগম করে। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে বলেছেন, ‘হে বৎস! তুমি যদি সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তোমার অন্তরে কারো প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ না রেখে কাটাতে পারো তাহলে তাই করো।’ এরপর তিনি বললেন, ‘হে বৎস! এটা আমার সুন্নাহ।

যে ব্যক্তি আমার সুন্নাহকে ভালোবাসে সে আমাকেই ভালোবাসে, আর যে আমাকে ভালোবাসে সে আমার সঙ্গে জান্নাতে থাকবে।’ (মিশকাতুল মাসাবিহ, হাদিস :  ১৭৫)

বিদ্বেষমুক্ত মানসিকতা জান্নাতের পথ সুগম করে : বাহ্যিক আমল বেশি না হলেও অন্তরের পরিচ্ছন্নতা এবং হিংসা, বিদ্বেষ ও ধোঁকামুক্ত মন—মানুষকে জান্নাতের উচ্চ মর্যাদায় পৌঁছে দিতে পারে। আল্লাহ তাআলা অন্তরের অবস্থাকে বিশেষ গুরুত্ব দেন। এক আনসারি সাহাবির সবচেয়ে বড় গুণ ছিল—তিনি কারো প্রতি হিংসা পোষণ করতেন না।

অন্যের প্রতি আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ামতের কারণে ঈর্ষা করতেন না। তিনি কখনো কোনো মুসলমানকে ধোঁকা দেওয়ার চিন্তাও করতেন না। নবীজি তাঁর জান্নাতি হওয়ার বিষয়ে অন্যদের জানিয়েছেন। আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে বসেছিলাম। এ সময় তিনি বললেন, ‘এখনই তোমাদের সামনে একজন জান্নাতি ব্যক্তি আগমন করবে।’

কিছুক্ষণ পর এক আনসারি সাহাবি উপস্থিত হলেন, যার দাড়ি থেকে অজুর পানি টপকে পড়ছিল। তিনি তাঁর জুতা জোড়া বাঁ হাতে ধরেছিলেন। পরের দিনও নবী (সা.) একই কথা বললেন। অর্থাৎ ‘এখনই তোমাদের সামনে এক জান্নাতি ব্যক্তির আগমন ঘটবে।’ সেদিনও সেই আনসারি উপস্থিত হলেন, যিনি আগের দিন এসেছিলেন এবং আজও তিনি প্রথম দিনের অবস্থায়ই ছিলেন। তৃতীয় দিনও নবী (সা.) একই কথা বললেন। আর সেই আনসারি সাহাবি উপস্থিত হলেন এবং তাঁর অবস্থা আগের দুই দিনের মতোই ছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) উঠে চলে যাওয়ার পর আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রা.) সেই আনসারি সাহাবির পিছু নিয়ে বললেন, ‘আমি আমার পিতার সঙ্গে ঝগড়া করে কসম খেয়েছি যে আমি তিন দিনের মধ্যে তাঁর কাছে যাব না। আপনি আমাকে আপনার কাছে তিন দিন অবস্থান করার অনুমতি দিন।’ আনসারি সাহাবি বললেন, ঠিক আছে।

আনাস ইবনে মালিক (রা.) বর্ণনা করেন, আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রা.) বলেন, ‘আমি এই তিন রাত সেই আনসারির সঙ্গে কাটিয়ে দেখলাম তিনি রাতে ইবাদতের জন্য ক্ষণিকের তরেও জাগ্রত হননি। আমি দেখেছি যখন তাঁর ঘুম ভেঙে যেত তখন নিজের বিছানায় শুয়ে আল্লাহর জিকির এবং তাকবির বলতেন। অতঃপর ফজরের জন্য জাগ্রত হতেন। আরেকটি বিষয় দেখেছি, তিনি তাঁর মুখ থেকে শুধু ভালো কথাই উচ্চারণ করতেন।’ তিন দিন অতিক্রমের পর আমি তাঁর আমলকে নগণ্যই মনে করেছিলাম। তখন আমি বললাম, “হে আল্লাহর বান্দা! আমার পিতার সঙ্গে আমার কোনো প্রকারের ঝগড়া-বিবাদ অথবা অসন্তুষ্টির কোনো বিষয় ছিল না। তবে আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে তিনবার বলতে শুনেছি যে ‘এখন তোমাদের সামনে এক জান্নাতি ব্যক্তির আগমন ঘটবে’ এবং তিনবারই আপনি আগমন করেছিলেন। তাই আমি আপনার সঙ্গে থেকে দেখতে চেয়েছি যে প্রকৃত পক্ষে আপনি কেমন আমল করেন (যা আমি করি না), যেন তা আমিও করতে পারি। কিন্তু আমি দেখলাম, আপনি অতিরিক্ত কোনো আমল করেন না। তাহলে কিসের ভিত্তিতে রাসুলুল্লাহ (সা.) আপনার ব্যাপারে এ কথা বলেছেন, যা আপনি শুনলেন?”

আনসারি সাহাবি জবাব দিলেন, ‘আমল তো শুধু তা-ই, যা আপনি দেখেছেন।’ আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রা.) বলেন, আমি তাঁর কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার সময় তিনি আমাকে ডেকে বললেন, ‘আমল তা-ই, যা আপনি দেখেছেন। তবে আমি কখনো কোনো মুসলমানকে ধোঁকা দেওয়ার কথা চিন্তা করি না এবং আমি কোনো ব্যক্তির কোনো কল্যাণের বিষয়ে হিংসা করি না, যা তাকে মহান আল্লাহ দান করেছেন।’ আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রা.) এ কথা শুনে বলেন, ‘এটাই সেই গুণ, যা আপনাকে সেই মর্যাদায় পৌঁছিয়েছে। আর যে গুণটি অর্জন করার সামর্থ্য আমাদের নেই।’

(মুসনাদে আহমাদ, হাদিস :  ১২৬৯৭)

বিদ্বেষ পোষণকারীদের বিশেষ সময়েও ক্ষমা করা হয় না : হিংসুক ও বিদ্বেষ পোষণকারীদের মহান আল্লাহর বিশেষ ক্ষমার বাইরে রাখা হয়। মহিমান্বিত রাতেও তাদের ক্ষমা করা হয় না। বোঝা যায়, হিংসা শুধু সামাজিক ব্যাধি নয়, বরং এটি আখিরাতের জন্য ভয়াবহ অন্তরায়। মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ তাআলা অর্ধ শাবানের রাতে (শাবানের ১৪ তারিখ দিনগত রাতে) সৃষ্টিকুলের প্রতি রহমতের দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও হিংসুক ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন।’

(সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস : ৫৬৬৫)

পরিশেষে বলা যায়, বিদ্বেষমুক্ত অন্তর ইসলামের এক অনন্য সৌন্দর্য ও নবীজির প্রকৃত সুন্নাহ। বাহ্যিক আমল সীমিত হলেও যদি মানুষের অন্তর হিংসা, বিদ্বেষ ও প্রতারণামুক্ত হয়, তবে আল্লাহ তাআলা তাকে জান্নাতের উচ্চ মর্যাদায় পৌঁছে দিতে পারেন। পক্ষান্তরে হিংসা এমন এক অন্তরব্যাধি, যা মানুষকে আল্লাহর বিশেষ রহমত থেকেও বঞ্চিত করে। অতএব, একজন মুমিনের জন্য অপরিহার্য হলো—নিজের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করা, অন্যের কল্যাণে আনন্দিত হওয়া এবং নবীজির এই মহান সুন্নাহকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করা। তাতেই নিহিত রয়েছে নবীজির ভালোবাসা ও জান্নাতে তাঁর সান্নিধ্য লাভের সৌভাগ্য।

লেখক : অধ্যাপক, আরবি বিভাগ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর