মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬, ১১:০১ পূর্বাহ্ন
নোটিশ:
তথ্য ও প্রচার মন্ত্রণালয় নিবন্ধনকৃত অনলাইন নিউজ পোর্টাল দ্য পিপলস্ নিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকে সারা দেশে জেলা প্রতিনিধি নিয়োগ করা হবে। মোবাইল: ০১৭১১-১১৬২৫৭, ০১৭১২-৪০৭২৮২ ' ই-মেইল : thepeopelesnews24@gmail.com

মতামতঃ ধর্ষণ-সংবাদে ভুক্তভোগীর পরিচয় প্রকাশ: সাংবাদিকতার নৈতিকতা কোথায় দাঁড়িয়ে?

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ / ৭ বার দেখা হয়েছে
আপডেট : মঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২৬

গণমাধ্যম সমাজের দর্পণ—এই কথাটি যতটা সত্য, তার চেয়েও বেশি সত্য হলো, এই দর্পণ যদি ভেঙে যায়, তাহলে সমাজের বিকৃত চিত্র আরও ভয়াবহভাবে প্রতিফলিত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে ধর্ষণসহ যৌন সহিংসতার শিকার ব্যক্তি বা নারীর পরিচয় প্রকাশের প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। নাম, ঠিকানা, ছবি কিংবা এমন সব পারিবারিক তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে, যা সহজেই ভুক্তভোগীকে শনাক্তযোগ্য করে তোলে। এটি কেবল সাংবাদিকতার নৈতিকতার লঙ্ঘন নয়—এটি এক ধরনের পেশাগত অপরাধও বটে।

ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের শিকার ব্যক্তি যখন বিচার, চিকিৎসা ও সামাজিক পুনর্বাসনের পথে হাঁটেন, তখন তার সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হয় গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা। কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেখা যাচ্ছে, সংবাদ প্রকাশের প্রতিযোগিতায় কিছু গণমাধ্যম সেই মৌলিক মানবিক বিবেচনাকেই উপেক্ষা করছে। “এক্সক্লুসিভ”, “ফার্স্ট রিপোর্ট” বা “ভাইরাল কনটেন্ট” তৈরির দৌড়ে নেমে তারা ভুক্তভোগীর পরিচয় উন্মোচন করছে—যা তাকে সমাজে নতুন করে অপমান, লজ্জা ও হয়রানির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

এটি কোনো সাধারণ ভুল নয়; বরং এটি দ্বিতীয়বারের মতো ভুক্তভোগীকে আঘাত করার শামিল। একজন ধর্ষণের শিকার ব্যক্তি ইতিমধ্যেই ভয়াবহ মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়ে যান। সেই ক্ষত শুকানোর আগেই যদি তার পরিচয় জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়, তবে তা তার ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক সম্পর্ক এবং সামাজিক অবস্থানকে ধ্বংস করে দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীকে সামাজিকভাবে “চিহ্নিত” করে ফেলা হয়, যা তার পুনরুদ্ধারের পথকে আরও কঠিন করে তোলে।

সাংবাদিকতার মৌলিক নীতি অত্যন্ত স্পষ্ট—ভিকটিমের পরিচয় গোপন রাখা বাধ্যতামূলক। এটি শুধু নৈতিক নির্দেশনা নয়, বরং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পেশাগত মানদণ্ড। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, কিছু ক্ষেত্রে এই নীতি উপেক্ষিত হচ্ছে, যা সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই প্রবণতা কেবল অনলাইন প্ল্যাটফর্মেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং কিছু মূলধারার গণমাধ্যমেও এর ছায়া পড়ছে। ফলে পুরো গণমাধ্যম ব্যবস্থার ওপরই সাধারণ মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে—সংবাদ পরিবেশন কি এখন দায়িত্বশীলতার জায়গায় আছে, নাকি প্রতিযোগিতার নামে সংবেদনশীলতা হারিয়ে ফেলেছে?

এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য এখনই কঠোর নীতিগত অবস্থান প্রয়োজন। সম্পাদকীয় পর্যায়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা জরুরি—ধর্ষণ বা যৌন সহিংসতার কোনো সংবাদে ভুক্তভোগীর পরিচয় প্রকাশ করা যাবে না। পাশাপাশি সাংবাদিকদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও জেন্ডার সেনসিটিভ রিপোর্টিং বিষয়ে বাধ্যতামূলক কর্মশালা চালু করতে হবে। প্রয়োজনে যারা বারবার এই নীতি ভঙ্গ করছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করাও সময়ের দাবি।

সাংবাদিকতা কোনো ব্যবসা নয়, এটি একটি জনসেবামূলক দায়িত্ব। সেই দায়িত্বের প্রথম শর্তই হলো মানবিকতা। ভুক্তভোগীর নাম প্রকাশ করে “সংবাদ” তৈরি করা সহজ হতে পারে, কিন্তু সেটি কখনোই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা নয়। বরং এটি ভুক্তভোগীর প্রতি দ্বিতীয় সহিংসতা, যা কোনো সভ্য গণমাধ্যম সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

আজ প্রয়োজন একটি স্পষ্ট অবস্থান—ভুক্তভোগীর মর্যাদা, নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষা করা কোনো বিকল্প নয়, এটি সাংবাদিকতার অপরিহার্য শর্ত। অন্যথায় গণমাধ্যম নিজেই তার নৈতিক ভিত্তি হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে।

আল আমিন,প্রকাশক ও সম্পাদক-সে অলওয়েজ ট্রুথ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর