মরিশাসের ঐতিহ্যবাহী উড়তে অক্ষম পাখি ‘ডোডো’কে নিয়ে দীর্ঘদিনের প্রচলিত ভুল ধারণা ভেঙে গুঁড়িয়ে দিচ্ছেন গবেষকরা। এতদিন ধরে এই পাখিকে চরম নির্বোধ, ধীরগতির ও বোকা হিসেবে চিত্রায়িত করা হলেও সাম্প্রতিক একটি গবেষণা সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলছে। গবেষণায় উঠে এসেছে, ডোডো পাখি মোটেও নির্বোধ ছিল না বরং এটি রাতের আঁধারে বা গোধূলির আলো-আধারিতে বিচরণকারী এক ধরনের নিশাচর পাখি হতে পারে।
‘জুলজিক্যাল জার্নাল অব দ্য লিনিয়ান সোসাইটি’-তে প্রকাশিত এই গবেষণায় বিজ্ঞানীরা আধুনিক সিটি স্ক্যান প্রযুক্তির সাহায্যে ডোডোর মাথার খুলি বিশ্লেষণ করে মস্তিষ্কের গঠন পুনর্নির্মাণ করেছেন। কানাডার ইউনিভার্সিটি অব লেথব্রিজের গবেষক সারা সিট্রনের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক গবেষক দল দেখতে পান, ডোডোর মস্তিষ্কের আকার তাদের শারীরিক অনুপাতের তুলনায় একদম স্বাভাবিক; ঠিক যেমনটা দেখা যায় তাদের নিকটাত্মীয় কবুতর বা ঘুঘু প্রজাতির পাখির ক্ষেত্রে। ফলে বুদ্ধিমত্তার দিক থেকে এরা কোনো অংশেই পিছিয়ে ছিল না।
মস্তিষ্কের স্ক্যান থেকে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর যে তথ্যটি সামনে এসেছে তা হলো, ডোডোর মস্তিষ্কের ‘অপ্টিক লোব’ বা দৃষ্টিশক্তি প্রক্রিয়াজাতকরণের অংশটি ছিল অস্বাভাবিক ছোট। একই সাথে তাদের ঘ্রাণশক্তি ছিল বেশ প্রখর। পাখিদের ক্ষেত্রে সাধারণত চোখের দৃষ্টির ওপর নির্ভরতা কম থাকলেই কেবল মস্তিষ্কের এই দৃশ্যমান অংশটি ছোট হয়ে থাকে। গবেষকদের মতে, অন্ধকারের পরিবেশ ছাড়া দৃষ্টিশক্তির প্রয়োজনীয়তা কম হওয়ার অন্য কোনো কারণ থাকতে পারে না। যা থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে পাখিটি মূলত নিশাচর বা গোধূলিচর ছিল।
প্রচলিত ইতিহাসের নথিপত্রে ডোডোদের নির্বোধ হিসেবে তুলে ধরার পেছনের কারণ মূলত নাবিকদের দেওয়া ভুল বিবরণী। শিকারিরা কোনো একটি ডোডোকে ধরে সেটিকে দিয়ে চিৎকার করাত, আর অন্য ডোডোরা সঙ্গীকে বাঁচাতে ছুটে আসত। শিকারিদের কাছে এটি বোকামি মনে হলেও গবেষকরা বলছেন, এটি ছিল তাদের সামাজিক অনুভূতির অংশ। মরিশাসের বিচ্ছিন্ন দ্বীপে কোটি বছর ধরে কোনো স্তন্যপায়ী শিকারি প্রাণী না থাকায় মানুষ বা তাদের আনা কুকুর, বিড়াল, শুকর ও ইঁদুরের মতো নতুন হুমকির মুখোমুখি হওয়ার জন্য ডোডোরা বিবর্তনের দিক থেকে প্রস্তুত ছিল না।
আঠারো শতকের শেষে মানুষের অনিয়ন্ত্রিত শিকার এবং বাসস্থান ধ্বংসের কারণে দ্রুত হারিয়ে যাওয়া ডোডো মোটেও কোনো বিবর্তনীয় ভুল ছিল না। বরং নতুন এই আবিষ্কার প্রমাণ করে, নিজেদের প্রাকৃতিক পরিবেশে টিকে থাকার জন্য তারা যথেষ্ট বুদ্ধিমান ও মানানসই একটি প্রজাতিই ছিল।
সূত্র: লাইভ সায়েন্স