ছোটবেলা থেকে আলোকচিত্রের প্রতি আপনার আগ্রহ কীভাবে তৈরি হলো?
আমার আলোকচিত্রের প্রতি আগ্রহের শুরু সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময়। এক রাতে আমার মামা বললেন, তিনি বাইরে ছবি তুলতে যাচ্ছেন। আমি অবাক হয়ে বলেছিলাম, চারপাশ তো অন্ধকার, এখন কীভাবে ছবি তুলবেন? তিনি মুচকি হেসে ট্রাইপড সেট করে ফোনের ম্যানুয়াল মোডে ছবি তোলা শুরু করলেন। ক্যামেরার পর্দায় অন্ধকারের দৃশ্যকে দিনের আলোর মতো দেখতে পেয়ে আমি সত্যিই অবাক হয়েছিলাম। সেই মুহূর্তেই লং-এক্সপোজার ফটোগ্রাফির প্রতি গভীর আগ্রহ তৈরি হয়। এরপর নিয়মিত ছবি তোলা এবং লং-এক্সপোজার নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করি।
সিলেটের প্রকৃতি আপনার ফটোগ্রাফির দৃষ্টিভঙ্গিকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে?
আমার জন্ম হবিগঞ্জে হলেও বাবা সেনা কর্মকর্তা হওয়ায় ছোটবেলা থেকেই সিলেটে বেড়ে ওঠার সুযোগ হয়েছে। পরে সিলেটের জালালাবাদ ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়াশোনা করেছি। সিলেটের সবুজ পরিবেশ, পাহাড় ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আমার ফটোগ্রাফির দৃষ্টিভঙ্গিতে গভীর প্রভাব ফেলেছে। এখানকার প্রকৃতি আমাকে ছোট ছোট, নীরব মুহূর্তগুলো মন দিয়ে দেখতে ও ক্যামেরায় ধারণ করতে অনুপ্রাণিত করেছে।
প্রকৃতি, ম্যাক্রো, অ্যাবস্ট্রাক্ট ও আরবান ফটোগ্রাফির মধ্যে নিজেকে কোথায় বেশি খুঁজে পান?
প্রকৃতি বা নেচার ফটোগ্রাফিতেই নিজেকে সবচেয়ে বেশি খুঁজে পাই। প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানো এবং তার ছোট ছোট সৌন্দর্য, আলো-ছায়া ও নীরব মুহূর্তগুলো নিজের দৃষ্টিভঙ্গিতে তুলে ধরতে ভালো লাগে। তবে ম্যাক্রো, অ্যাবস্ট্রাক্ট ও আরবান ফটোগ্রাফিতেও নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করি।
‘বোটানিক্যাল সাইলেন্স’ সিরিজের ভাবনাটি কীভাবে শুরু হয়েছিল?
ফটোগ্রাফি জার্নাল ও শিল্পবিষয়ক ম্যাগাজিনগুলোয় সাধারণত একটি নির্দিষ্ট ভাবনা বা গল্পকে কেন্দ্র করে তৈরি ধারাবাহিক কাজকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। নিজের ছবিগুলো দেখতে গিয়ে খেয়াল করি, কয়েকটি ছবির মধ্যে একই ধরনের শান্ত অনুভূতি রয়েছে। তখন মনে হলো, এগুলো আলাদা ছবি নয়; বরং একটি নির্দিষ্ট অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত। সেখান থেকেই ছবিগুলোকে সিরিজ হিসেবে সাজানোর সিদ্ধান্ত নিই। এভাবেই ‘বোটানিক্যাল সাইলেন্স’-এর শুরু।
‘বোটানিক্যাল সাইলেন্স’ নামটির পেছনে কী ভাবনা রয়েছে?
‘বোটানিক্যাল’ বলতে গাছপালা ও ফুলকে বোঝায়, আর ‘সাইলেন্স’ বলতে প্রকৃতির সেই নীরব উপস্থিতিকে বোঝায়, যা ব্যস্ততার কারণে আমরা অনেক সময় খেয়াল করি না। ফুলকে শুধু সৌন্দর্যের বিষয় হিসেবে নয়; বরং পাপড়ির গঠন, পাতার টেক্সচার, আলো-ছায়া ও স্থিরতার মধ্য দিয়ে একটি স্বতন্ত্র চরিত্র হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছি।
গাছপালা ও ফুলকে প্রচলিত প্রকৃতি-ফটোগ্রাফির বাইরে কীভাবে উপস্থাপন করতে চেয়েছেন?
ফুল ও গাছপালাকে শুধু সুন্দর বা সাজসজ্জার বিষয় হিসেবে দেখাতে চাইনি। পাপড়ির গঠন, পাতার সূক্ষ্ম টেক্সচার, আলো-ছায়া ও আকৃতির মতো ছোট বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েছি। পরিচিত প্রাকৃতিক বিষয়গুলো কাছ থেকে, ধৈর্য নিয়ে পর্যবেক্ষণ করে ভিন্ন ও অন্তরঙ্গ দৃষ্টিভঙ্গিতে তুলে ধরাই ছিল মূল উদ্দেশ্য।
লং-এক্সপোজার ও আলো-ছায়ার ব্যবহার আপনার ছবিকে কীভাবে আলাদা করে?
লং-এক্সপোজার আমার ফটোগ্রাফির শুরু থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। এই কৌশলের মাধ্যমে বুঝতে পারি, ক্যামেরা চোখে দেখা দৃশ্যের বাইরেও আলো ও সময় অন্যভাবে ধারণ করতে পারে। এটি আমাকে আলো-ছায়াকে শুধু দৃশ্যের অংশ নয়, ছবির আবহ ও অনুভূতি তৈরির মাধ্যম হিসেবে দেখতে শিখিয়েছে। ‘বোটানিক্যাল সাইলেন্স’-এ সরাসরি লং-এক্সপোজার সব ছবিতে ব্যবহার না করলেও নরম আলো, গভীর ছায়া ও সূক্ষ্ম বিবরণের মাধ্যমে সেই আলোনির্ভর দৃষ্টিভঙ্গি ধরে রাখার চেষ্টা করেছি।
একটি ছবি তোলার আগে গল্প বা অনুভূতি কল্পনা করেন, নাকি মুহূর্ত থেকেই ছবি তৈরি হয়?
সাধারণত ক্যামেরার ফ্রেমের ভেতর দৃশ্যটিকে কীভাবে দেখা যাবে, তা মনে মনে কল্পনা করি। ফ্রেম দেখার সময়ই ছবিটির সম্ভাব্য রূপ তৈরি হতে থাকে; বিশেষ করে লং-এক্সপোজারের ক্ষেত্রে শাটার চাপার আগেই ধারণা করার চেষ্টা করি, এক্সপোজার শেষ হলে আলো, চলমান বিষয় ও সময়ের প্রভাব ছবিতে কীভাবে ফুটে উঠবে।
সম্পাদনা সফটওয়্যার আপনার কাজের ক্ষেত্রে কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
ছবি তোলার পরের সম্পাদনাকে পুরো প্রক্রিয়ার একটি অংশ মনে করি, তবে একে ছবির মূল বিষয় মনে করি না। ছবি তোলার সময় যেভাবে দৃশ্যটি দেখেছি, সেটি যতটা সম্ভব ধরে রাখি। প্রয়োজন অনুযায়ী আলো, রং ও ছবির আবহ ঠিক করতে সম্পাদনা করি। সাধারণত স্ন্যাপসিড ব্যবহার করি। অ্যাডোবি লাইটরুম খুব বেশি ব্যবহার করিনি। তাই সফটওয়্যারের চেয়ে সঠিক আলো, কম্পোজিশন ও মুহূর্তকে গুরুত্ব দিই।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে আপনার কাজ প্রকাশিত হয়েছে। এই স্বীকৃতি আপনার কাছে কী অর্থ বহন করে?
আন্তর্জাতিকভাবে আমার কাজ প্রকাশিত হওয়াকে শুধু একজন আলোকচিত্রী হিসেবে স্বীকৃতি হিসেবে দেখি না; এর সঙ্গে আমার দেশের পরিচয়ও জড়িয়ে আছে। ল’ওয়েই দ্য লা ফটোগ্রাফি, কলেটারাল, স্পেকটাকুলাম, আর্থ ডট অর্গ, ওয়ালম্যাগ, বায়রন ম্যাগাজিন কিংবা ওয়ার্থওয়াইল ম্যাগাজিনের মতো প্ল্যাটফর্মে কাজ প্রকাশিত হলে এবং নামের পাশে ‘বাংলাদেশি আলোকচিত্রী’ পরিচয়টি দেখলে ভালো লাগে। মনে হয়, আমার কাজের মাধ্যমে ছোট পরিসরে হলেও বাংলাদেশের পরিচয় পৌঁছে দিতে পারছি। এই স্বীকৃতিগুলো আরও ভালো কাজ করার দায়িত্ববোধও তৈরি করে।
আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে কাজ পৌঁছানোর অভিজ্ঞতা কেমন?
শুরুতে ফটোগ্রাফি ম্যাগাজিনে ছবি জমা দিলেও তেমন সাড়া পেতাম না। অনেক সময় কোনো উত্তরও আসত না। তারপরও চেষ্টা চালিয়ে গেছি। এই বছরের শুরুতে ‘বোটানিক্যাল সাইলেন্স’ তৈরি করার পর বিষয়টি বদলাতে শুরু করে। পুরো কাজ ছবি ও বিবরণসহ কলেটারালে জমা দেওয়ার পরদিনই তারা ইনস্টাগ্রামে বার্তা দিয়ে জানায়, তারা সিরিজটি নিয়ে নিবন্ধ প্রকাশ করতে চায়।
এরপর ওয়ালম্যাগে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সুযোগ পাই। দ্য আই অব ফটোগ্রাফিতে ‘বোটানিক্যাল সাইলেন্স’ প্রকাশের বিষয়টিও ই-মেইলের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়। পরে বায়রন ম্যাগাজিন, স্পেকটাকুলাম ম্যাগাজিন, ক্যামেরাপিক্সো প্রেসসহ আরও কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রকাশনায় কাজ প্রকাশিত হয়েছে। ওয়ালম্যাগ, ওয়ার্থওয়াইল, গ্ল্যাজআর্টসহ কয়েকটি প্রকাশনায় সাক্ষাৎকারও দিয়েছি। কোনো কিউরেটর, ম্যাগাজিন বা সম্পাদকের কাছ থেকে ইতিবাচক মতামত পাওয়া আমার কাছে অনেক বড় পাওয়া। আল্লাহর রহমতে এই সুযোগগুলোর জন্য আমি কৃতজ্ঞ।
আপনার ছবিতে প্রকৃতির নীরবতা, সৌন্দর্য ও রহস্য কীভাবে কাজ করে?
আমার কাছে প্রকৃতির নীরবতা, সৌন্দর্য ও রহস্য একে অপরের সঙ্গে জড়িত। প্রকৃতির সৌন্দর্য সব সময় চোখে পড়ার মতো হয় না; অনেক সময় ছোট ছোট বিবরণ, স্থিরতা ও নীরবতার মধ্যেই তা লুকিয়ে থাকে। তাই আলো, ছায়া, গঠন ও সূক্ষ্ম বিবরণের মাধ্যমে প্রকৃতির নীরব উপস্থিতি তুলে ধরার চেষ্টা করি। সেই নীরবতার মধ্যেই তৈরি হওয়া অজানা অনুভূতি ছবিটিকে আরও গভীর করে।
এই পথচলায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী ছিল?
আমার বয়স ১৯ বছর হলেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজ প্রকাশের পথটা শুরুতে সহজ ছিল না। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল কীভাবে ফটোগ্রাফি ম্যাগাজিনে ছবি জমা দিতে হয়, কোথায় কাজ পাঠাতে হয় বা কীভাবে প্রকাশিত হওয়া যায় এসব জানতাম না। শুরুর দিকে নিজেকেই শিখতে হয়েছে কোন প্রকাশনায় ছবি জমা নেওয়া হয়, কীভাবে কাজ উপস্থাপন করতে হয় এবং কী ধরনের প্রকল্প পাঠানো উচিত। অনেক জায়গায় ছবি পাঠিয়েও সাড়া পাইনি। তবে সেগুলো থেকে শেখার চেষ্টা করেছি। আমার কাছে সবচেয়ে বড় বিষয় ছিল, না জানার কারণে থেমে না যাওয়া। নিজের কাজের প্রতি বিশ্বাস রেখে চেষ্টা করে যাওয়াই আমাকে আজকের জায়গায় আসতে সাহায্য করেছে।








