ইসলামের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় জাকাত একটি মৌলিক স্তম্ভ। এটি কেবল একটি আর্থিক দান নয়; বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত একটি ইবাদত, যা ধনীদের সম্পদকে পবিত্র করে এবং সমাজের দরিদ্র মানুষের অধিকার নিশ্চিত করে। পবিত্র কোরআনে বহু স্থানে নামাজের সঙ্গে জাকাতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহতায়ালা বলেন : ‘তোমরা নামাজ কায়েম করো এবং জাকাত আদায় করো’ (সুরা আল-বাকারা : ৪৩)। জাকাতের মূল উদ্দেশ্য হলো সমাজে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা এবং দরিদ্র মানুষের কষ্ট লাঘব করা। যখন একজন মুসলমান তার সম্পদের নির্ধারিত অংশ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ব্যয় করে, তখন তার সম্পদ পবিত্র হয় এবং সমাজে ভ্রাতৃত্ব ও সহমর্মিতার পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
জাকাত যাদের ওপর ওয়াজিব : শরিয়তের দৃষ্টিতে জাকাত ফরজ হওয়ার জন্য কয়েকটি শর্ত পূরণ হওয়া আবশ্যক। ব্যক্তি মুসলমান হতে হবে। তার কাছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকতে হবে। সেই সম্পদের ওপর এক বছর অতিক্রান্ত হতে হবে। নিসাব পরিমাণ সম্পদের মধ্যে স্বর্ণ, রুপা, নগদ অর্থ, ব্যবসায়িক পণ্য এবং কিছু ক্ষেত্রে কৃষিজ ফসল ও পশু অন্তর্ভুক্ত হয়। সংক্ষেপে বলা যায়, যে ব্যক্তির মালিকানায় সাড়ে সাত ভরি সোনা বা সাড়ে বায়ান্ন ভরি রুপা অথবা সাড়ে বায়ান্ন ভরি রুপার সমপরিমাণ জাকাতযোগ্য সম্পদ থাকে এবং ওই সম্পদ এক বছর অতিবাহিত হয়, তখন তার ওপর জাকাত ফরজ হয়ে যায়।
জাকাত পাওয়ার উপযুক্ত : কোরআনে কারিমের নির্দেশনা অনুযায়ী আট শ্রেণির মানুষ জাকাত পাওয়ার অধিকারী: দরিদ্র, নিঃস্ব, শরিয়ত সমর্থিত জাকাত সংগ্রহকারী, নতুন মুসলমান বা যাদের হৃদয় ইসলামের দিকে আকৃষ্ট করা প্রয়োজন, (বিশেষ বিবেচনায়) দাস মুক্তির জন্য, ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি, আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে রত ব্যক্তি, মুসাফির। পিতা-মাতা, দাদা-দাদি, সন্তান-সন্ততিকে এবং স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে জাকাত দেওয়া যায় না (সুরা তাওবাহ-৬০)।
জাকাত প্রদানে সতর্কতা : জাকাত একটি ফরজ ইবাদত হওয়ায় এটি যথাযথভাবে আদায় করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় মানুষ আবেগ বা অজ্ঞতার কারণে এমন ব্যক্তিকে জাকাত দিয়ে বসে, যে প্রকৃতপক্ষে জাকাতের উপযুক্ত নয়। তাহলে জাকাত আদায় হবে না। তাই জাকাত দেওয়ার আগে প্রাপকের অবস্থা যাচাই করা জরুরি। পাশাপাশি জাকাতের সম্পদ যেন অপচয় বা অন্যায় কাজে ব্যবহৃত না হয়, সেদিকেও সতর্ক থাকতে হবে। এ ছাড়া জাকাত দেওয়ার সময় নিয়ত করা ও নিয়ত বিশুদ্ধ থাকা জরুরি। লোক দেখানো বা সামাজিক মর্যাদা অর্জনের উদ্দেশে জাকাত দিলে এর প্রকৃত সওয়াব নষ্ট হয়ে যেতে পারে। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই জাকাত আদায় করতে হবে।
বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জাকাত প্রদান : বর্তমান সময়ে অনেক সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠন জাকাত সংগ্রহ করে দরিদ্রদের মাঝে বিতরণ করে থাকে। সঠিকভাবে পরিচালিত হলে এ ধরনের উদ্যোগ সমাজকল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিশ্বাসযোগ্যতা। জাকাতের অর্থ আল্লাহর নির্ধারিত হক। তাই তা এমন প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়া উচিত, যারা স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে এই অর্থ বণ্টন ব্যবস্থাপনা করে। কিন্তু যদি সন্দেহ থাকে যে অর্থ সঠিকভাবে বিতরণ হচ্ছে না, তাহলে ব্যক্তিগতভাবে প্রকৃত দরিদ্র মানুষের হাতে জাকাত পৌঁছে দেওয়াই উত্তম। যখন জাকাত সঠিকভাবে আদায় হবে, তখন সমাজে দারিদ্র্য কমবে, ভ্রাতৃত্ব বৃদ্ধি পাবে এবং ইসলামের অর্থনৈতিক সৌন্দর্য বাস্তবে প্রতিফলিত হবে। বাংলাদেশসহ অনেক দেশে একটি বাস্তব সমস্যা হলো, সর্বত্র নানা স্তরে দুর্নীতির অভিযোগ। বিশেষ করে ত্রাণ বিতরণ, সামাজিক সহায়তা কর্মসূচি ইত্যাদি ক্ষেত্রে অনিয়মের খবর শোনা যায়। শরিয়তের নির্দেশনা হলো, জাকাত অবশ্যই প্রকৃত হকদার ব্যক্তির মালিকানায় পৌঁছাতে হবে। যদি এমন আশঙ্কা থাকে যে জাকাতের অর্থ সঠিক ব্যক্তির কাছে পৌঁছাবে না, বা মাঝপথে অপব্যবহার হবে, তাহলে সেখানে জাকাত দেওয়া শরিয়তের দৃষ্টিতে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায়।
অথবা যদি প্রবলভাবে ধারণা হয়, সঠিকভাবে বণ্টিত হবে না, তাহলে সেখানে জাকাত দেওয়া থেকে বিরত থাকাই উত্তম। ইসলামের ইতিহাসে খোলাফায়ে রাশেদীনদের যুগে রাষ্ট্রই জাকাত সংগ্রহ ও বণ্টনের দায়িত্ব পালন করত। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতিতে যদি দেখা যায় যে প্রশাসনিক দুর্নীতি, অনিয়ম বা রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে জাকাতের অর্থ সঠিকভাবে দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছাবে না, তাহলে সেখানে জাকাত দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি। অতএব, জাকাতের ক্ষেত্রে মূল নীতি হওয়া উচিত, যে পদ্ধতিতে নিশ্চিতভাবে হকদারের কাছে জাকাত পৌঁছায়, সেই পদ্ধতিই গ্রহণ করা। যখন এই সচেতনতা সমাজে বৃদ্ধি পাবে, তখন জাকাত সত্যিকার অর্থেই দারিদ্র্য দূরীকরণ ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটি শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠবে।
♦ লেখক : গবেষক, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বসুন্ধরা, ঢাকা