রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬, ১২:১০ অপরাহ্ন
সর্বশেষ
নোটিশ:
তথ্য ও প্রচার মন্ত্রণালয় নিবন্ধনকৃত অনলাইন নিউজ পোর্টাল দ্য পিপলস্ নিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকে সারা দেশে জেলা প্রতিনিধি নিয়োগ করা হবে। মোবাইল: ০১৭১১-১১৬২৫৭, ০১৭১২-৪০৭২৮২ ' ই-মেইল : thepeopelesnews24@gmail.com

সময়ের পরিক্রমায় প্লাষ্টিকের নান্দনিক ছোঁয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে বাঁশশিল্পের তৈজষপত্র

জলিল রানা, জয়পুরহাট প্রতিনিধি : / ৮১ বার দেখা হয়েছে
আপডেট : বুধবার, ১৮ মার্চ, ২০২৬

আধুনিকতার আদলে প্লাষ্টিকের নান্দনিক ছোঁয়ায় বাহারি ডিজাইনের সাংসারিক ও পারিবারিক জীবনের সাচ্ছন্দময় ব্যবহারে নিত্য প্রয়োজনীয় আসবাব পত্রের ভীরে হারিয়েযেতে বসেছে নিপূন হাতের নৈপণ্যময় বাঁশের তৈরী তৈজষপত্র,সংকটে জয়পুরহাটের মাহালী সম্প্রদায়।

বাঁশের তৈরী জিনিসপত্রকেই একমাত্র জীবিকা নির্বাহের পেশা হিসেবে আঁকড়ে ধরে আছেন জেলার এ মাহালী সম্প্রদায়। বাঁশ দিয়ে তৈরি বিভিন্ন শৈলপ্লবিক পণ্য বাপ-দাদার আদী পেশা হওয়ায় অনেকেই অন্য পেশায় যেতে পারছেন না। আর তা ছাড়া অন্য কোনো কাজ না জানার কারণে বাধ্য হয়েই এ পেশায় সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।

অন্যদিকে প্লাস্টিকের রকমারী আসবাব পত্রের ভীরে বাঁশের তৈরি জিনিসপত্রের চাহিদা দিন দিন কমেই যাচ্ছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও এ শিল্পের জিনিসপত্রের চাহিদা কমে যাওয়ায় মানবেতর জীবন পার করচ্ছেন তারা। সম্প্রতি এ ব্যবসায় মন্দাভাব নেমে আশায় বাঁশ শিল্পের সাথে জড়িত পরিবারগুলোর দিনাতিপাত চলছে দুর্দিনে।

জেলায় একসময় বিভিন্ন গ্রাম গঞ্জে শত-শত মাহালী পরিবার তাদের সু-নিপূন হাতের বাহারি কারুকাজ সম্বলীত বাঁশের মাদুর, ঘর, ঝুড়ি, ফাঁদ, মাছ ধরার চাঁই, জুইতা, বাঁশের দোচালা, চারচালা ও আটচালা ঘর, বাঁশের বেড়া, ফুলদানি, প্রসাধনী বাক্স, ছবির ফ্রেম, আয়নার ফ্রেম, কলম কাল্লোং, বারেং, দোলনা, কুলা, টোপা, মাথুল, পলয়, ডালি,চাঙ্গারী, খলই সহ সাংসারিক আরও অনেক কিছুই তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। সময়ের পালাবদল, দেশের প্লাষ্টিক শিল্প জগত সংসার জীবনের সবখানে আধিপত্য বিস্তারের ফলে কালের গর্ভে বিলিন হচ্ছে এই বাঁশশিল্প। সময়ের পরিক্রমায় একদিকে বাঁশের দাম বেশি অন্যদিকে তাদের পণ্যের চাহিদা ও  দাম কম থাকায় চরম বিপাকে পড়েছেন এ সম্প্রদায়।

জয়পুরহাটের মাহালী সম্প্রদায়:
সরেজমিন জেলা সদরের খঞ্জনপুর ও জেলার পাঁচবিবি উপজেলার দমদমা মাহালী এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, আগে মাহালী সম্প্রদায় যে সময়টাতে সকাল থেকে রাতভর পর্যন্ত বাঁশের জিনিস তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করতেন তারা এখন অনেকটাই বসে বসে অলস সময় পার করছেন। এমন পরিস্থিতিতেও দৃঢ় মনোবল নিয়ে বাঁশের পণ্য তৈরি ও বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহের নিত্য সংগ্রাম করে যাচ্ছেন পাঁচবিবি উপজেলা দমদমা এলাকার দ্বীনেশ চন্দ্রের ৬ সদস্যের একটি পরিবার।

দ্বীনেশ চন্দ্রের স্ত্রী পার্বতী রানী একজন নিপূন হাতের কারিগর তিনি  জানিয়েছেন, আমরা পরিবারের ৬ জন লোক। আমার স্বামী রাস্তার পাশে দোকানে বিক্রি করে, বাঁকি আমরা ৫ জন বাঁশের পণ্য তৈরি করে থাকি। বিভিন্ন এলাকা থেকে বাঁশ সংগ্রহ করার পরে বাঁশগুলো পণ্যের মানভেদে চিকন আকারের শলা বা বাতি তৈরি করে রোদে শুকিয়ে বানানো হয় নানা পণ্যসামগ্রী। এ কাজটি তার বাপের বাড়িতেও করেছেন তবে বর্তমানে পরিশ্রমের দাম ওঠে না। এজন্য খুব কষ্টে দিন কাটছে তাদের।

জেলার খঞ্জনপুর মাহালি পরিবারের সুদক্ষ বাঁশশিল্পের আর এক কারিগর ধীরেন চন্দ্র তিনি জানান, প্লাস্টিক ও অনন্য জিনিস পত্রের ব্যবহার বেশি হওয়ায় বর্তমানে বাঁশের তৈরি পণ্যের আর কদর নেই বললেই চলে। বাঁশের তৈরি জিনিস ঠিকমতো বিক্রি হয় না।

এক সময় গ্রামীণ জনপদের মানুষগুলো গৃহস্থালি সহ কৃষি ও ব্যবসা বানিজ্যের নানা ক্ষেত্রেও বাঁশের তৈরি সরঞ্জাম ব্যবহার হতো উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, একটি বাঁশ ১৬০-১৮০ টাকায় কিনে সেই বাঁশ দিয়ে ২ দিনে দুটি চাঙ্গারি তৈরি করে সে চাঙ্গারি দুটি বিক্রি হয় ৩০০ টাকা। এই দিয়ে কিভাবে চলি বলেন? বাজারে সব জিনিসের দাম বেশি, চরম বিপদে আছি আমরা। তবে এখনও রমজান মাস এলে বাঁশের তৈরি সেমাই খাঁচির চাহিদা কিছুটা থাকে।

জেলায় নাম না বলার শর্তে এ সম্প্রদায়ের অনেকেই জানিছেন, দেশে কত সরকার আসে যায়, নেতারা বড়লোক হয় আমাদের খবর কেউ রাখেনা। আমরাও যে এদেশের নাগরিক,আমাদের চাহিদা খুবী সামান্য, আমাদেরও দুবেলা শাক ভাত খেয়ে পরে বেঁচে থাকার অধিকার আছে এটাও এখন আর আমরা বলতে পারিনা। ভোট এলে স্থানীয় নেতাদের কাছে আমাদের দাম বাড়ে। দেখা হলেই সালাম দেয়। ভোটের পর কেউ-ই আমাদের আর চিন্তে পারেনা।

জয়পুরহাট বিসিক শিল্পনগরী উপ-ব্যাবস্থাপক লিটন চন্দ্র ঘোষ বলেন, জয়পুরহাট এলাকায় প্রচুর মানুষ এ বাঁশ শিল্পে যুক্ত আছেন। বর্তমানে এসব পণ্যের ব্যবহার কমে যাওয়ায় তারা খুব কষ্টে জীবন যাপন করছেন। সরকারিভাবে কোনো সাহায্য সহযোগিতা আসলে আমরা তা তাদের মধ্যে বন্টন করে থাকি। তারা চাইলে প্রশিক্ষণ ও ঋণ সহায়তা দেওয়া হবে।

জেলায় বিভিন্ন শ্রেণী পেশার গণ্য মান্য ও সচেতন ব্যক্তির সাথে কথা হলে তাঁরা জানান, এ শিল্প বাঁচিয়ে রাখতে এবং এ শিণ্পের সাথে সম্পৃক্ত সম্প্রদায়ের জীবনমান উন্নয়নে সরকারের শক্তিশালী পৃষ্ঠপোষকতার পাশা-পাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের এগিয়ে আসার এখন সময়ের দাবী।

চিরায়ত গ্রাম বাংলার পুরনো ঐতিহ্যবাহী এ বাঁশশিল্প টিকে থাক,নিপূণ হাতের নৈপূণ্যে কারুকাজে এ শিল্পের মানুষগুলোর জীবনে আবার ফিরে আসুক নিত্য কর্মচাঞ্চল্যতা,নতুন করে বাঁচার আশায় তাদের জীবন ভরে উঠুক নব উদিত সূর্যের সোনালী আলোর ভেলায়। ঐতিহ্যবাহী এ বাঁশশিল্প টিকে থাক, মাহালী সম্প্রদায় এগিয়ে যাক, এমনটাই প্রত্যাশা প্রতিবেদকের।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর