জয়পুরহাট জেলার কালাই পৌরসভার থুপসাড়া মহল্লার ছালেমা খাতুন।একসময় যার নুন আনতেপান্তা ফুরানোর গল্প অনেকের কাছে ছিল অতি পরিচিত। কিন্তু আজ তার অদম্য ইচ্ছা শক্তি কাজে লাগিয়ে গবাদিপশু পালনে শ্রম বিনিয়গের মাধ্যমে তিনি আজ সাফল্যের অনেকটাই বাস্তবে ছুঁতে পেরেছেন। নিজ খামারের আয় দিয়ে শুধু ইটের আধুনিক ফ্ল্যাট বাড়িই তৈরী করেননি, ৫-৬ বিঘা বর্গা জমিও কিনেছেন ছালেমা । ছেলে-মেয়ের পড়ালেখা ও বিয়ে সামলিয়ে এলাকায় এখন তিনি এক স্বাবলম্বী নারীর উজ্জল দৃষ্টান্ত। ছালেমার এই সাফল্য এখন পুরো জেলার গ্রামীণ অর্থনীতির পরিবর্তনের এক নতুন উদাহরণ।
ছালেমা খাতুনের মতো জেলার পাঁচবিবি, কালাই, ক্ষেতলাল, আক্কেলপুর এবং সদর উপজেলার হাজার হাজার খামারি এখন গবাদিপশু পালনে খুঁজে পেয়েছেন নতুন আশার আলো। আসন্ন ঈদ-উল আজহা সামনে রেখে জেলার ২৬ হাজার খামারে এখন চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। পশুপালন এখন আর কেবল মৌসুমি কোনো কাজ বা ব্যবসা নয় বরং এটি এখন এ অঞ্চলের মানুষের প্রধান লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে।
কালাই পৌরসভার থুপসাড়া মহল্লার নারী খামারি ছালেমা খাতুন জানান, সারা বছর তার খামারে ৬-৭টি গরু থাকে এবং প্রতি বছর অন্তত দুটি গরু বিক্রি করেন। গরু পালন করেই তিনি ইটের বাড়ি ও খামার গড়ে তুলেছেন, পাশাপাশি কয়েক বিঘা জমিও বর্গা নিয়ে চাষাবাদ করছেন। দুধ বিক্রির আয় দিয়েই সংসার ও গরুর খাদ্যের খরচ মেটান। ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া করিয়ে বিয়েও দিয়েছেন। তার দেখাদেখি এলাকার অনেক পরিবারই এখন গরু পালন করে হয়েছে স্বাবলম্বী ।
জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্য বলছে, এ বছর জয়পুরহাটে রেকর্ড সংখ্যক কোরবানিযোগ্য পশু প্রস্তুত করা হয়েছে। জেলায় ৩ লাখ ২৬ হাজার ৭৫৩টি পশু কোরবানির জন্য তৈরি, এর বিপরীতে স্থানীয় চাহিদা ২ লাখ ৩ হাজার পশুর। ফলে জেলা থেকে প্রায় ১ লাখ ২৩ হাজার পশু উদ্বৃত্ত থাকবে, যা রাজধানী ঢাকা-চট্টগ্রাম সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পশুর চাহিদা মেটাতে বড় ভূমিকা রাখবে।
তৃণমূলের এই সাফল্যের কারিগরদের মধ্যে জেলরা পাঁচবিবি উপজেলার সরাইল-মোহাম্মদপুরের এ এন মহিউদ্দিনের খামারে রয়েছে ১২০টি গরু। আবার কালাই পাঁচশিরা এলাকার আলী আনছার, যিনি ২০১৫ সালে চাতাল ব্যবসা ছেড়ে মাত্র ৫টি গরু দিয়ে শুরু করেছিলেন, তার খামারে রয়েছে এখন ১৯টি গরু।
আলী আনছার জানান, শুধু দুধ বিক্রির টাকা দিয়েই খামারের দৈনন্দিন খরচ উঠে যায়, আর বড় গরু বা বাছুর বিক্রি থেকে আসে নিট মুনাফা। প্রতিটি গরু দুই থেকে আড়াই লাখ টাকায় বিক্রি করে তিনি এখন সচ্ছল।
পশুপালনের বিপ্লবে যুক্ত হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তি ও নিরাপদ পদ্ধতি:
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা: মহির উদ্দিন জানান, খামারিরা এখন ক্ষতিকর ইনজেকশন বা ওষুধের পরিবর্তে প্রাকৃতিক উপায়ে ঘাস, ভুট্টা ও খৈল খাইয়ে পশু মোটাতাজাকরণে বেশি আগ্রহী। এতে করে যেমন একদিকে ভোক্তা পর্যায়ে নিরাপদ মাংস নিশ্চিত হচ্ছে তেমনি অন্যদিকে স্বাস্থ্য ঝুকিও কমে আসছে। এছাড়া জেলা ১০টি স্থায়ী ও ১৭টি অস্থায়ী পশুর হাটে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সহায়তায় ১৩টি ‘ভেটেরিনারি’ মেডিকেল টিম সার্বক্ষণিক কাজ করবে।
খামারকেন্দ্রিক এই অর্থনীতি গ্রামগুলোতে বহুমুখী উপ-অর্থনীতি সচল করেছে। গোখাদ্য বিক্রেতা, পশুচিকিৎসক,পরিবহন শ্রমিক এবং বাঁশ-দড়ির ব্যবসায়ীদের বহুগুণ বেড়েছে কর্মব্যস্ততা ।
কালাই উপওজলার গোখাদ্য ব্যবসায়ী জালাল উদ্দীন বলেন, কোরবানির মৌসুমে আমাদের বেচাকেনা কয়েকগুণ বেড়ে যায়, যা গ্রামীণ বাজার ব্যবস্থাপনাকে চাঙ্গা রাখছে।
তবে খামারিরা বলছেন, গোখাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও সহজ শর্তে ঋণের অভাব এখন যেন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখাদিয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতামত:
অর্থনীতিবিদদের মতামত এখাত বেকারত্ব দূরীকরণে এক বিরাট শক্তি।
কালাই সরকারি মহিলা কলেজের অর্থনীতি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান আব্দুল ওহাব সাখিদার বলেন, পশুপালন পরিবারে নগদ অর্থের প্রবাহ বাড়াচ্ছে এবং নারীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলছে। গ্রামে ইটের পাকা বাড়ি ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন-ই প্রমাণ করে, গরুর খামার এখন গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়নের টেকসই ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এম.এ.জলিল রানা,জয়পুরহাট:১৬ মে-২০২৬।
মোবাইল: ০১৯৩১-৩৮৩৪৬৬-E-mail:rana5w1h85@gmail.com