বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি)-এর অভ্যন্তরে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটকে ঘিরে নতুন করে নানা অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশের দাবি, সংস্থাটির কিছু প্রভাবশালী কর্মকর্তা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও ঠিকাদারি কার্যক্রমে অস্বাভাবিক প্রভাব বিস্তার করছেন। এতে প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং স্বাভাবিক প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ও মহাব্যবস্থাপক (বীজ) মোঃ আবীর হোসেন এবং নির্বাহী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মোঃ কামরুজ্জামান। অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলোর দাবি, এই দুজনকে ঘিরেই একটি শক্তিশালী বলয় গড়ে উঠেছে, যা বিভিন্ন প্রকল্প, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও ঠিকাদারি কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করছে।
বিএডিসির একাধিক সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরেই তাদের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ উঠলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কার্যকর তদন্ত হয়নি। বরং অভিযোগগুলো বিভিন্নভাবে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে চাপা আতঙ্ক, অসন্তোষ ও হতাশা তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বীজ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও সরবরাহ সংশ্লিষ্ট বড় বড় প্রকল্পে এই সিন্ডিকেটের প্রভাব দৃশ্যমান। ঠিকাদার নির্বাচন, কাজের মান নির্ধারণ এবং যন্ত্রপাতি সরবরাহের বিভিন্ন ধাপে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। কিছু ক্ষেত্রে নিম্নমানের সরঞ্জাম ব্যবহারের অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
আরও অভিযোগ রয়েছে, কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতির তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশের সম্ভাবনা দেখা দিলেই সেটি ঠেকাতে বিভিন্ন তৎপরতা চালানো হয়। কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেন, অতীতে সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সংবাদ প্রকাশ বন্ধ বা প্রভাবিত করার চেষ্টাও হয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই সম্ভব হয়নি, তবুও বিষয়গুলো নিয়ে বিএডিসির অভ্যন্তরে ব্যাপক আলোচনা চলছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, “কোনো অনিয়ম নিয়ে আলোচনা শুরু হলেই বিভিন্নভাবে সেটি থামানোর চেষ্টা হয়। এতে সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।”
আরেক কর্মকর্তা অভিযোগ করে বলেন, “কিছু ব্যক্তি নিজেদের এতটাই ক্ষমতাধর মনে করেন যে, তারা প্রশাসনিক কাঠামোকেও গুরুত্ব দেন না। এতে স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে।”
অভিযোগ রয়েছে, এই প্রভাবশালী গোষ্ঠীর কারণে অনেক যোগ্য ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। পদোন্নতি ও পদায়ন প্রক্রিয়ায়ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, যা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে অসন্তোষ আরও বাড়িয়ে তুলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের কৃষি খাতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান বিএডিসিতে এ ধরনের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। কারণ দেশের কৃষি উৎপাদন অনেকাংশে নির্ভরশীল বিএডিসির বীজ, সার ও সেচ ব্যবস্থাপনার ওপর। ফলে এখানে প্রশাসনিক অস্থিরতা বা অনিয়ম তৈরি হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে কৃষকদের ওপর।
বিশেষ করে আসন্ন রবি মৌসুমকে সামনে রেখে উদ্বেগ বাড়ছে। সংশ্লিষ্ট মহলের আশঙ্কা, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বোরো ধান, গম, ভুট্টা, আলু, ডাল ও তেলবীজের জন্য প্রয়োজনীয় বীজ ও সার সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। এতে দেশের খাদ্য নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছেন তারা।
কৃষি বিশ্লেষকদের মতে, “বিএডিসিতে যদি অনিয়মের অভিযোগ থেকে থাকে, তাহলে দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করা জরুরি। একইসঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।”
অভিযোগের বিষয়ে মোঃ আবীর হোসেন বলেন,
“আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আমি সবসময় নিয়ম মেনেই দায়িত্ব পালন করেছি।”
অন্যদিকে মোঃ কামরুজ্জামানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, দীর্ঘদিন ধরে ঘুরে ফিরে আসা এসব অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। এতে যেমন প্রকৃত দায়ীদের শনাক্ত করা সম্ভব হবে, তেমনি নির্দোষ কর্মকর্তারাও বিতর্কমুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবেন।
বিএডিসির অভ্যন্তরে চলমান এই পরিস্থিতি কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক সংকট নয়—এটি দেশের সামগ্রিক কৃষি ব্যবস্থাপনা ও খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাই সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে এর প্রভাব ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।