বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬, ১২:৩৬ পূর্বাহ্ন
সর্বশেষ
নোটিশ:
তথ্য ও প্রচার মন্ত্রণালয় নিবন্ধনকৃত অনলাইন নিউজ পোর্টাল দ্য পিপলস্ নিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকে সারা দেশে জেলা প্রতিনিধি নিয়োগ করা হবে। মোবাইল: ০১৭১১-১১৬২৫৭, ০১৭১২-৪০৭২৮২ ' ই-মেইল : thepeopelesnews24@gmail.com

সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘনাচ্ছে সর্বনাশ, মোকাবেলায় কতোটা প্রস্তুত বাংলাদেশ?

অনলাইন ডেস্ক: / ৭ বার দেখা হয়েছে
আপডেট : মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬
-এআই নির্মিত ছবি।

স্ক্রিনে একটা আলতো টোকা, আর তাতেই ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে আস্ত একটা জীবন! বিজ্ঞানের যে আশীর্বাদ মানুষের হাতের মুঠোয় থাকার কথা ছিল, তা আজ রূপ নিয়েছে এক অদম্য দানবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম একসময় ছিল শুধুই যোগাযোগের সেতু, আজ তা হয়ে উঠেছে গুজব, অপপ্রচার আর চরিত্রহননের এক ভয়াবহ মরণফাঁদ। প্রতিদিন কোটি কোটি চোখ আটকে থাকছে ফেসবুক আর ইউটিউবের দুনিয়ায়, অথচ এই বিপুল শক্তির পেছনে লুকিয়ে থাকা অন্ধকারকে নিয়ন্ত্রণ করার কোনো লাগাম নেই আমাদের হাতে।

সাধারণ সংবাদমাধ্যমের জন্য আইন আছে, জবাবদিহিতা আছে, কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার এই উত্তাল জোয়ারে কোনো নিয়মের তোয়াক্কা নেই। বিশেষ করে ফেসবুকের ‘রিলস’ নামক এক নতুন ফাঁদ এখন অপরাধীদের অভয়ারণ্য। কে, কখন, পৃথিবীর কোন প্রান্ত থেকে একটা বিভ্রান্তিকর বা মানহানিকর ভিডিও আপলোড করে দিল, তার হদিস মেলা ভার। মুহূর্তের মধ্যে সেই বিষাক্ত কনটেন্ট পৌঁছে যাচ্ছে লাখো মানুষের স্ক্রিনে, ধ্বংস করে দিচ্ছে সমাজ ও ব্যক্তির সম্মান, অথচ এই অপরাধের উৎস খুঁজে বের করা যেন এক দুর্ভেদ্য ধাঁধা।

আমাদের দেশে ঐতিহ্যবাহী গণমাধ্যমগুলোকে প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশনস অ্যাক্ট মেনে চলতে হয়, সেখানে যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে আইনি প্রতিকারের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু ফেসবুক, ইউটিউব কিংবা গুগলের মতো বিশ্ব কাঁপানো প্রযুক্তি জায়ান্টদের এ দেশে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক অস্তিত্বই নেই। কোনো নিয়মের বেড়াজালে তাদের বাঁধা যাচ্ছে না, কারণ এ দেশে তাদের কোনো ঘরবাড়ি নেই, নেই কোনো অফিস। ফলে, তারা যেন সমস্ত আইনের ঊর্ধ্বে থেকে এক সমান্তরাল সাম্রাজ্য চালিয়ে যাচ্ছে।

সংখ্যাটা শুনলে যে কেউ চমকে উঠবেন, বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা এখন ১০ কোটি ছাড়িয়েছে, যার মধ্যে প্রায় সাড়ে সাত কোটি মানুষ ফেসবুকের পেছনে নিজেদের সময় আর শ্রম ঢালছেন। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা রাজস্ব নিয়ে যাচ্ছে সিলিকন ভ্যালির শাসকেরা। বাংলাদেশ তাদের জন্য এক বিশাল সোনার খনি, অথচ এই খনি থেকে কোটি কোটি ডলার হাতিয়ে নিলেও এ দেশের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি প্রতিনিধি অফিস খোলার ন্যূনতম প্রয়োজন মনে করেনি তারা।

যখনই কোনো আপত্তিকর ছবি, উসকানিমূলক বক্তব্য কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি কোনো নোংরা ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে, তখন আমাদের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি কেবল এক অসহায় দর্শকের ভূমিকা পালন করে। তাদের করতে হয় স্রেফ মেইল চালাচালি। প্রযুক্তি জায়ান্টদের কৃপা আর তাদের তথাকথিত ‘কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড’-এর ওপর নির্ভর করে বসে থাকতে হয় দিনের পর দিন। ততক্ষণে যা ক্ষতি হওয়ার, তা হয়ে যায়; একটা মিথ্যা দাবানলের মতো পুড়িয়ে ছারখার করে দেয় সাজানো সংসার কিংবা সামাজিক সম্প্রীতি।

অথচ বিশ্বের অন্যান্য দেশ কিন্তু এই ডিজিটাল ঔপনিবেশিকতার সামনে এভাবে হাঁটু গেড়ে বসে থাকেনি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন মেটা ও গুগলকে শত কোটি ডলার জরিমানা করে বুঝিয়ে দিয়েছে যে, তাদের আইন ভাঙার পরিণতি কতটা ভয়ানক হতে পারে। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতও তাদের নিজস্ব আইটি আইনের মাধ্যমে এই পরাশক্তিগুলোকে নতি স্বীকার করতে বাধ্য করেছে, স্থাপন করিয়েছে স্থানীয় কার্যালয়। জার্মানি বা অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলোতেও আজ আর প্রযুক্তি জায়ান্টরা স্বেচ্ছাচারিতা চালানোর সাহস পায় না।

বাংলাদেশ সরকার অবশ্য এবার নড়েচড়ে বসার ইঙ্গিত দিচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, ক্ষতিকর কনটেন্ট অপসারণে আন্তর্জাতিক এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করার মতো কঠোর বিধান সাইবার সুরক্ষা আইনে যুক্ত করা হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়, যে প্রতিষ্ঠানের কোনো আনুষ্ঠানিক কার্যালয়ই এ দেশে নেই, তার ওপর আপনি আইনের চাবুক মারবেন কীভাবে? দেশের বাইরে বসে থাকা এক অদৃশ্য শক্তির ওপর এ দেশের অভ্যন্তরীণ আইন প্রয়োগ করা কি আদৌ সম্ভব, যদি না তাদের এখানে অফিস স্থাপন করতে বাধ্য করা যায়?

প্রযুক্তির স্বাধীনতা আমরা অবশ্যই চাই, কিন্তু সেই স্বাধীনতার নামে কোটি মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার লাইসেন্স কাউকেই দেওয়া যায় না। আজ এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে যেভাবে রাজনৈতিক অপপ্রচার, নারীদের ভুয়া ছবি ও অডিও ছড়িয়ে ব্ল্যাকমেল করা হচ্ছে, তা সমাজকে এক গভীর নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই অদৃশ্য যুদ্ধক্ষেত্রে আমাদের সাধারণ নাগরিকেরা আজ একেবারেই অরক্ষিত, যেখানে প্রতিদিন জন্ম নিচ্ছে নতুন নতুন সাইবার ট্র্যাজেডি।

সময় এসেছে এই অসহায়ত্বের দেয়াল ভেঙে ফেলার। ফেসবুক-ইউটিউবকে সাফ জানিয়ে দেওয়ার সময় এসেছে যে, এ দেশে ব্যবসা করতে হলে এ দেশের মানুষকে সম্মান করতে হবে, মানতে হবে এখানকার আইন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অবাধ স্বাধীনতা বজায় রেখেই তাদের জবাবদিহিতার কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে। তা না হলে, প্রযুক্তির এই অভিশাপের আগুনে পুড়তে হবে আমাদের আগামী প্রজন্মকে, আর আমরা কেবল চেয়ে চেয়ে দেখব এক ডিজিটাল ধ্বংসলীলা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর