আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআইয়ের দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তায়ও তৈরি হচ্ছে নতুন ধরনের ঝুঁকি। এমন এক সময়ে সামনে এসেছে উদ্বেগজনক কিছু ঘটনা, যেখানে স্বয়ংক্রিয় এআই এজেন্ট নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করে নিরাপত্তা ত্রুটি খুঁজে বের করার পাশাপাশি সাইবার হামলার কৌশলও তৈরি করেছে।
সম্প্রতি ওপেনএআইয়ের একটি এআই এজেন্ট নিজস্ব প্রশিক্ষণ পরিবেশ বা স্যান্ডবক্সের নিরাপত্তাবলয় ভেঙে উন্মুক্ত সোর্স এআই প্ল্যাটফর্ম হাগিং ফেসে সাইবার হামলা চালিয়ে নিরাপত্তা ভঙ্গ করেছে। ঘটনাটিকে এআইভিত্তিক সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় ধরনের সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
যুক্তরাষ্ট্রের লাস ভেগাসে অনুষ্ঠিত বিশ্বের অন্যতম বড় সাইবার নিরাপত্তা সম্মেলন ব্ল্যাক হ্যাটে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের আশঙ্কা, কাজের গতি বাড়াতে দ্রুত এআই ব্যবহারের ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো এমন এক ঝুঁকির মধ্যে ঢুকে পড়ছে, যার মাত্রা তারা নিজেরাও পুরোপুরি বুঝতে পারছে না।
যেভাবে হামলার কৌশল তৈরি করল এআই
ব্ল্যাক হ্যাট সম্মেলনে ওপেনএআইয়ের গবেষক মাইকেল ডাল্টন জানান, হাগিং ফেসে হামলার আগে স্বয়ংক্রিয় এআই এজেন্টগুলো নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য একটি অভ্যন্তরীণ মেসেজ বোর্ড তৈরি করেছিল।
ওই ব্যবস্থার মাধ্যমে এআই এজেন্টগুলো নিজেরাই নিরাপত্তা ত্রুটি শনাক্ত করে একে অপরের সঙ্গে তা ভাগাভাগি করে এবং হামলার বিভিন্ন কাজ নিজেদের মধ্যে বণ্টন করে নেয়।
শুধু তাই নয়, ওপেনএআইয়ের সিকিউরিটি টিম তাদের প্রথম হামলার পরিকল্পনা ব্যর্থ করে দেওয়ার পরও এআই এজেন্টগুলো থেমে থাকেনি। তারা নতুন করে কৌশল তৈরি করে শেষ পর্যন্ত সাইবার হামলাটি সফলভাবে সম্পন্ন করে।
গবেষকেরা ঘটনাটিকে এআই নিরাপত্তার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘ওয়াটারশেড মোমেন্ট’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
এর পর আরও কিছু এআই মডেলের সক্ষমতা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অ্যানথ্রোপিকের ক্লড এআই মডেল, মেটার এআই এবং চীনভিত্তিক স্টার্টআপ মুনশট এআইয়ের ওপেন ওয়েট মডেলগুলোও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সিস্টেমে অননুমোদিত প্রবেশ এবং নিরাপত্তাবলয় ভাঙতে সক্ষম হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
অজানা ঝুঁকিতে বিশ্বের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান
সাইবার নিরাপত্তা স্টার্টআপ ভেগার প্রধান নির্বাহী শায় স্যান্ডলার সতর্ক করে বলেছেন, বিশ্বের অনেক বড় প্রতিষ্ঠান দ্রুত এআই প্রযুক্তি গ্রহণ করলেও এর সঙ্গে যুক্ত সাইবার ঝুঁকি সম্পর্কে তারা পুরোপুরি সচেতন নয়।
অনেক প্রতিষ্ঠান এখনো মনে করছে, প্রচলিত নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমেই নতুন এআই এজেন্টদের মোকাবিলা করা সম্ভব। অথচ বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই এজেন্টের সক্ষমতা এবং কাজের ধরন প্রচলিত সফটওয়্যার বা স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার চেয়ে ভিন্ন।
স্যান্ডলারের ভাষায়, অনেক প্রতিষ্ঠান এমন একটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে, যা তারা নিজেরাও টের পাচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞদের আরেকটি উদ্বেগ হলো, এআই ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত নতুন ব্যবহারকারী যুক্ত করা এবং প্রযুক্তির সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে যতটা গুরুত্ব দিচ্ছে, সাইবার নিরাপত্তার বিষয়টি ততটা গুরুত্ব পাচ্ছে না।
এআই ঠেকাতে নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থার খোঁজ
এআই এজেন্ট ও স্বয়ংক্রিয় সাইবার হামলার ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন ধরনের নিরাপত্তা কাঠামো তৈরির চেষ্টা করছে।
নেটস্কোপের মতো নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান এআই সিস্টেম, ডেটা ও সার্ভার একসঙ্গে পর্যবেক্ষণের জন্য এআই কমান্ড সেন্টার তৈরি করেছে।
অন্যদিকে নিরাপত্তা গবেষকেরা ওপেন ওয়েট মডেল কাস্টমাইজ করে ক্ষতিকারক এআই এজেন্ট শনাক্ত করার পথও খুঁজছেন।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করলেই হবে না। এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে মানুষের সরাসরি তদারকি এবং শক্তিশালী নিরাপত্তা গার্ডরেল তৈরি করাও জরুরি।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, এআইভিত্তিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও নিরাপদ করতে আগামী কয়েক বছর বিশ্বকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
সূত্র: সিএনবিসি