আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালীতে যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব পড়েছে। ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত প্রায় পাঁচ মাসে এই প্রণালী দিয়ে মোট ১৪৫৪টি জাহাজ চলাচল করেছে। অথচ স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিনই গড়ে প্রায় ১০০টি জাহাজ এই জলপথ অতিক্রম করে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে পোর্টওয়াচের উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
হরমুজ প্রণালী পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মধ্যে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত জলপথ। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব অনেক। তবে ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই এই পথে বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচলে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়।
যুদ্ধ শুরুর পর তলানিতে নৌচলাচল
যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০০টি জাহাজ হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করত। কিন্তু ২৮ ফেব্রুয়ারি হামলা শুরুর পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। ২ মার্চ ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসি প্রণালী বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার পর জাহাজ চলাচল আরও কমে যায়।
আল জাজিরার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৮ এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে মাত্র ২৭৮টি জাহাজ হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করে। এ সময়ে প্রতিদিন গড়ে মাত্র সাতটি জাহাজ চলাচল করেছে।
এরপর ১৩ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সমুদ্রবন্দরে অবরোধ আরোপ করলে পরিস্থিতির বড় কোনো উন্নতি হয়নি। ১৩ এপ্রিল থেকে ১৭ জুন পর্যন্তও প্রতিদিন গড়ে সাতটি জাহাজ এই জলপথ ব্যবহার করেছে।
সাময়িক সমঝোতায় কিছুটা বাড়ে চলাচল
তবে ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতা হওয়ার পর হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল কিছুটা বাড়তে শুরু করে।
১৮ জুন থেকে ১৪ জুলাই পর্যন্ত মোট ৬১৫টি জাহাজ প্রণালীটি অতিক্রম করে। এ সময়ে দৈনিক গড় জাহাজ চলাচল বেড়ে দাঁড়ায় ২৩টিতে।
তবে এই স্বস্তি বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। ১৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্র আবার অবরোধ আরোপ করলে জাহাজ চলাচল ফের কমে যায়। ১৫ থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত মাত্র ৯৯টি জাহাজ হরমুজ প্রণালী পার হতে পেরেছে। এ সময়ে দৈনিক গড় নেমে আসে ১১টিতে।
যেসব জাহাজে সবচেয়ে বেশি প্রভাব
যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিভিন্ন ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল কমেছে। এর মধ্যে রয়েছে তেলবাহী ট্যাঙ্কার, কনটেইনার জাহাজ, ড্রাই বাল্ক ক্যারিয়ার, সাধারণ কার্গো এবং রোল অন রোল অফ জাহাজ।
আল জাজিরার তৈরি উপাত্তভিত্তিক চিত্রে দেখা যায়, সংঘাতের পুরো সময়জুড়ে ট্যাঙ্কার ও কনটেইনার জাহাজের চলাচল উল্লেখযোগ্য ছিল। তবে যুদ্ধ শুরুর পর সামগ্রিকভাবে সব ধরনের জাহাজের সংখ্যাই দ্রুত কমে যায়।
যুদ্ধের বিভিন্ন ঘটনা ও অবরোধের প্রভাবও জাহাজ চলাচলের পরিসংখ্যানে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১ মার্চ চারটি ট্যাঙ্কারে হামলা, ২ মার্চ আইআরজিসির হরমুজ বন্ধের ঘোষণা, ২৫ জুন এভার লাভলি নামের কনটেইনার জাহাজে হামলা এবং জুলাইয়ের নতুন হামলা ও মার্কিন অবরোধের মতো ঘটনাগুলো এ সময়ের নৌচলাচলে প্রভাব ফেলে।
হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলের এই বড় পতন শুধু সামুদ্রিক পরিবহন খাতেই নয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের ওপরও যুদ্ধের প্রভাব কতটা বিস্তৃত হয়েছে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র তুলে ধরছে।
সূত্র: আলজাজিরা