নিষেধাজ্ঞা, হুমকি ও হামলার মধ্যেও ইরানের পারমাণবিক শিল্প এগিয়ে যাচ্ছে বলে দাবি করেছেন দেশটির পরমাণু শক্তি সংস্থার (এইওআই) প্রধান মোহাম্মদ ইসলামী। তার ভাষ্য, পারমাণবিক প্রযুক্তির পাশাপাশি স্বাস্থ্য, কৃষি, খাদ্য উৎপাদন ও রেডিওফার্মাসিউটিক্যালস বা তেজস্ক্রিয়তাভিত্তিক ওষুধের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে ইরান।
ইরানের সংবাদমাধ্যম নুর নিউজের প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ ও বিতর্ক রয়েছে। বিশেষ করে দেশটির ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে তেহরানের বিরোধ তীব্র হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা আশঙ্কা করে আসছে, ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহার করা হতে পারে।
তবে ইরান বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। তেহরানের দাবি, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কোনও পরিকল্পনা তাদের নেই এবং দেশটির ইউরেনিয়াম মজুত ও সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম সম্পূর্ণ বেসামরিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন, চিকিৎসা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও অন্যান্য শান্তিপূর্ণ কাজে এসব প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা বলে আসছে ইরান।
মিথ্যা অভিযোগ সত্ত্বেও এগিয়ে যাচ্ছি
ইরানের পরমাণু শক্তি সংস্থার প্রধান মোহাম্মদ ইসলামী বলেন, পারমাণবিক শিল্পের ওপর বিভিন্ন ধরনের চাপের পাশাপাশি ইরানের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অভিযোগও তোলা হচ্ছে।
তিনি বলেন, এসব অভিযোগ যারা তুলছে, তারাও জানে যে সেগুলো সত্য নয়। তারপরও নিষেধাজ্ঞা, হুমকি ও হামলার মতো পরিস্থিতির মধ্যেও ইরানের পারমাণবিক খাতের কর্মীরা তাদের দায়িত্ব দক্ষতার সঙ্গে পালন করে যাচ্ছেন।
ইসলামী বলেন, প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও তার সংস্থার কর্মীরা জ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রবর্তী পর্যায়ে দেশের অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন।
তার বক্তব্যে পারমাণবিক প্রযুক্তিকে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে স্বাস্থ্য, কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনসহ বিভিন্ন বেসামরিক খাতে ব্যবহারের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
কৃষিতে বিকিরণ প্রযুক্তির ব্যবহার
পারমাণবিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ইসলামী কৃষি ও খাদ্যপণ্যে বিকিরণ প্রযুক্তির প্রয়োগের বিষয়টি তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, কৃষি ও খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে বিকিরণ প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য ব্যাপকভাবে কাজ করেছে ইরান। এ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়া বিভিন্ন পণ্য ও বীজে উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
ইসলামীর ভাষ্য অনুযায়ী, প্লাজমা বা বিকিরণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়া কিছু পণ্য ও বীজে উৎপাদন কমপক্ষে ৩০ শতাংশ বেড়েছে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধির হার ১০০ শতাংশ পর্যন্ত হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
কৃষিতে বিকিরণ প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে বীজের গুণগত মান, ফলন এবং খাদ্যপণ্যের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য উন্নত করার লক্ষ্য রয়েছে বলে ইরানি কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
ক্যান্সার চিকিৎসায় পারমাণবিক প্রযুক্তি
ইসলামী এসব মন্তব্য করেন ইরানে শিশুদের ক্যান্সার শনাক্তকরণ ও চিকিৎসার জন্য দেশটির প্রথম একাডেমিক কেন্দ্র উদ্বোধনের অনুষ্ঠানে।
চিকিৎসাক্ষেত্রে পারমাণবিক প্রযুক্তির গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার রয়েছে। বিশেষ করে রেডিওফার্মাসিউটিক্যালস ব্যবহার করে বিভিন্ন রোগ শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা করা হয়। ইরান দীর্ঘদিন ধরেই চিকিৎসাক্ষেত্রে নিজস্ব রেডিওফার্মাসিউটিক্যালস উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
শিশুদের ক্যান্সার নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য নতুন একাডেমিক কেন্দ্র চালুর বিষয়টি তাই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বেসামরিক ব্যবহারের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন দেশটির কর্মকর্তারা।
যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও কর্মসূচি চালুর দাবি
ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো অতীতে বিভিন্ন হামলা ও নাশকতার লক্ষ্য হয়েছে বলে তেহরান অভিযোগ করে আসছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞাও ইরানের পারমাণবিক ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি খাতের ওপর প্রভাব ফেলেছে।
এই পরিস্থিতিতে ইসলামী দাবি করেছেন, এসব চাপ সত্ত্বেও ইরান তার পারমাণবিক প্রযুক্তির উন্নয়ন অব্যাহত রেখেছে।
তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ এখনও পুরোপুরি কাটেনি। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা, মজুত এবং আন্তর্জাতিক পরিদর্শন ও নজরদারি নিয়ে তেহরান ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।
ইরানের বক্তব্য হলো, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির লক্ষ্য শান্তিপূর্ণ ব্যবহার। আর পশ্চিমা দেশগুলো দেশটির পারমাণবিক সক্ষমতার সম্ভাব্য সামরিক ব্যবহারের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে।
এই বিরোধের মধ্যেই ইরান স্বাস্থ্য, কৃষি ও চিকিৎসায় পারমাণবিক প্রযুক্তির ব্যবহার তুলে ধরে তাদের কর্মসূচির বেসামরিক চরিত্রের ওপর জোর দিচ্ছে। মোহাম্মদ ইসলামীর সর্বশেষ বক্তব্যও সেই অবস্থানেরই পুনরাবৃত্তি। সূত্র: আল-জাজিরা