ইসলাম পরিপূর্ণ ও কল্যাণমুখী জীবনব্যবস্থা। ইসলাম মানুষের দেহ, মন ও আত্মার সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করতে চায়। মূলত ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের জীবন আল্লাহর মহা দান ও অনুগ্রহ। একইভাবে তা মানুষের কাছে অর্পিত আল্লাহ তাআলার আমানতও বটে। তাই মানুষ নিজের দেহ ও আত্মার প্রতি স্বেচ্ছাচারী হতে পারে না। ইচ্ছা করলেই দেহ ও মনের ওপর নিপীড়ন করতে পারে না। ইসলামের দৃষ্টিতে আত্মপীড়ন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং এ জন্য পরকালে মানুষকে জবাবদিহি করতে হবে।
আত্মপীড়ন কাকে বলে?
আত্মপীড়ন বলতে বোঝায় নিজের শরীর বা মনের প্রতি এমন আচরণ করা, যা ক্ষতিকর, যন্ত্রণাদায়ক বা ধ্বংসাত্মক। যেমন—নিজের শরীরে আঘাত করা, খাদ্য বা চিকিৎসা থেকে নিজেকে বঞ্চিত করা, আনন্দের উপলক্ষ থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখা, পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আত্মাকে কষ্ট দেওয়া, মানসিকভাবে নিজেকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাওয়া এবং আত্মহত্যা করা।
ইসলামে আত্মপীড়ন নিষিদ্ধ
শরিয়তে আত্মপীড়ন কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে মানবজাতিকে আত্মপীড়ন থেকে দূরে থাকতে বলা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমরা নিজেদের হত্যা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ২৯)। এই আয়াত দ্বারা প্রমাণ হয় আত্মহত্যা তো বটেই, নিজের ক্ষতি হয় এমন যেকোনো কাজও নিষিদ্ধ। কেননা আল্লাহ মানুষের প্রতি দয়ালু এবং তিনি চান না মানুষ নিজেকে ধ্বংস করুক।
অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তোমরা নিজেদের ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করো না।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৯৫) উল্লিখিত আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসিরবিদরা বলেন, যে কাজ মানুষের দেহ, মন, জীবন ও ঈমানের ক্ষতি করে এবং যা কিছু ধ্বংসাত্মক তা করা মুমিনের জন্য নিষিদ্ধ। একাধিক হাদিসে নবীজি (সা.) আত্মপীড়ন বা নিজেকে কষ্ট দিতে নিষেধ করেছেন। তিনি মানবজাতিকে ভারসাম্যপূর্ণ জীবনের দীক্ষা দিয়েছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই তোমার ওপর শরীরের অধিকার আছে, তোমার ওপর তোমার চোখের অধিকার আছে, তোমার ওপর তোমার স্ত্রীর অধিকার আছে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫১৯৯)
হাদিস দ্বারা বোঝা যায়, শরীরের যত্ন নেওয়া এবং তার অধিকার আদায় করা আবশ্যক। যেসব কাজে নিজের দেহ ও মন বঞ্চিত, কষ্ট পায়, তা নিষেধ। অন্য হাদিসে নবীজি (সা.) বলেন, ‘যে লোক পাহাড়ের ওপর থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করে, সে জাহান্নামের আগুনে পুড়বে, চিরকাল সে জাহান্নামের ভেতরে সেভাবে লাফিয়ে পড়তে থাকবে। যে লোক বিষপানে আত্মহত্যা করবে, তার বিষ জাহান্নামের আগুনের মধ্যে তার হাতে থাকবে, চিরকাল সে জাহান্নামের মধ্যে তা পান করতে থাকবে। যে লোক লোহার আঘাতে আত্মহত্যা করবে, জাহান্নামের আগুনের ভেতর সে লোহা তার হাতে থাকবে, চিরকাল সে তা দিয়ে নিজের পেটে আঘাত করতে থাকবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৭৭৮) এই হাদিসে আত্মহত্যা ও আত্মপীড়নের ভয়াবহ পরিণতির ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে।
ইসলামের দৃষ্টিতে সাধারণ আত্মপীড়ন তো নিষিদ্ধই। এমনকি মহানবী (সা.) ইবাদতের নামেও নিজেকে কষ্ট দিতে নিষেধ করেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘হে আবদুল্লাহ! আমাকে কি এ খবর প্রদান করা হয়নি যে তুমি রাতভর ইবাদতে দাঁড়িয়ে থাকো এবং দিনভর সিয়াম পালন করো? আমি বললাম, হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসুল! তিনি বললেন, তুমি এরূপ কোরো না, বরং রোজাও রাখো, ইফতারও কোরো, রাত জেগে ইবাদত কোরো এবং নিদ্রাও যাও। নিশ্চয়ই তোমার ওপর শরীরের অধিকার আছে, তোমার ওপর তোমার চোখের অধিকার আছে, তোমার ওপর তোমার স্ত্রীর অধিকার আছে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫১৯৯)
উল্লিখিত আলোচনা থেকে প্রমাণিত হলো, ইসলামের দৃষ্টিতে আত্মপীড়ন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। মানুষের জীবন আল্লাহর দান। আর এই দানের যথাযথ সংরক্ষণ করা প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব। ইসলাম চায় মানুষ সুস্থ, সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবন যাপন করুক। আত্মপীড়ন নয়, বরং আত্মসংযম, আত্মযত্ন ও আল্লাহর ওপর ভরসাই ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা। আল্লাহ সবাইকে কবুল করুন। আমিন।